Sunday 14 August 2016

ধর্ম, দেশভাগ, পাকিস্তান এবং পাকিস্তানি ভূতের কথা

পাকিস্তানের জাতীয় কবি আল্লামা ইকবাল তার বাবাকে কথা দিয়েছিলেন তিনি কবিতা লেখার বিনিময়ে কোন অর্থ নিবেন না। সব কথা রাখা যায় না, একসময় টাকার অভাবে কবিতা দিয়েই জীবন নির্বাহ করতে হলো তাকে। কবিতার জন্য পেয়েছিলেন বৃটিশ সরকারের দেয়া নাইট উপাধি। বৃটিশদের নাইট উপাধি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পেয়েছিলেন, যদিও পরে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে এই নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। তবে এই দুজনের মিলও আছে। মিলটা কবিতা দিয়ে রাষ্ট্রে প্রভাব ফেলায়।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা দেশভাগের পর ভারতের জাতীয় সংগীত হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতা লাইন থেকে এসেছে। শ্রী লংকার জাতীয় সংগীতের সুরও কবি রবীন্দ্রনাথের লেখা গান থেকে নেয়া হয়েছে। তবে এক জায়গায় আল্লামা ইকবাল এগিয়ে, সেটা হলো তার কবি স্বত্তার থেকে বেরিয়ে এসে একটা রাষ্ট্রের দাবি করে বসেছিলেন। আরও মজার ব্যাপার হলো তার দ্বারা দুটি রাষ্ট্র ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল, একটা ইরান এবং আরেকটা পাকিস্তান।

শিয়ালকোটের ছেলে ইকবাল লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি ও জার্মানী থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী নিয়ে ১৯০৯ সালে তার তৎকালীন দেশ বৃটিশ ভারতে ফিরে এসে আইন ব্যবসা শুরু করে ব্যর্থ হন। তারপর সাহিত্য চর্চায় জড়িয়ে পড়েন, সাফল্যও পান তবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়েন ভালোভাবে। ইকবালের লেখা জুড়ে থাকতো ইসলামী পুনর্জাগরণের গল্প। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের চিন্তানায়ক ড. আলী শরিয়তী এক সময় সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ইরানে আবার ইকবাল তার ফার্সি লেখার জন্য বিখ্যাত ছিলেন, আর তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত ছিলেন। ইরানের শিয়া জনগোষ্ঠীতে তার জনপ্রিয়তা ছিলো।

ইকবালের লেখার দ্বারা খুব প্রভাবিত আরও দুজন মানুষ ছিলেন। একজন পাকিস্তানের কায়েদ-ই-আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। আরেকজনের নাম এই লেখার শেষে বলছি। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন জন্মগতভাবে গুজরাটি। বাবা-মা শিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী। জিন্নাহ্ নিজেকে শুধু মুসলমান দাবি করতেন, যদিও তিনি ধার্মিক ছিলেন না। তার চলাফেরায় ছিলো পাশ্চাত্যের প্রভাব। সাধারণ ভারতীয়দের থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে পরতেন কারাকুল টুপি, যা এখন জিন্নাহ্ টুপি নামে জনপ্রিয়। প্রথমদিকে জিন্নাহ ছিলেন মুসলিম লীগের মধ্যপন্থী নেতা, হিন্দু-মুসলিম ভাতৃত্ববোধ বজায় রেখে স্বাধীন ভারতই ছিলো তার ম্যান্ডেট। ১৯৩০ সালে মুসলিম লীগের অধিবেশনে আল্লামা ইকবাল প্রথম মুসলমানদের নিয়ে সর্বপ্রথম রাষ্ট্র করার প্রস্তাব উপস্থাপন করে। মোটকথা পাকিস্তানের স্বপ্ন তখনই দেখতে শুরু করে। ইসলামী পুর্ণজাগরণের স্বপ্নে বিভোর ইকবালের এই স্বপ্নের পাকিস্তান একসময় বাস্তবে রূপ নেয়, তবে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে থাকেনি, হয়েছিলো ইসলামের সাইনবোর্ড ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতি পাঞ্জাবীদের অত্যাচার-অবিচারের রাষ্ট্র। যাই হোক, সে কথায় পরে আসছি।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ কংগ্রেসেরও সদস্য ছিলেন একসময়, তখন একসাথে দুটো সংগঠনের সদস্য থাকা যেতো। গান্ধীর সাথে ব্যাক্তিত্বের দ্বন্দ (বিশেষ করে গান্ধীর ভারতীয় পোষাক আর ইংরেজীর পরিবর্তে ভারতীয় ভাষায় কথা বলাকে ধর্মান্ধতা মনে করতেন জিন্নাহ্) আর কংগ্রেসে প্রবল হিন্দুত্ববাদীদের প্রতাপে জিন্নাহ্ একসময় সুবিধা করতে পারলেন না।


কংগ্রেস থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে কবি ইকবাল আর ইকবালের সমমনাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এক সময় মুসলমানদের নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র করার জোর দাবি বৃটিশদের সামনে তুলে ধরেন। এখানে উল্লেখ্য ইসলামী রাষ্ট্রর দাবি জানালেও জিন্নাহ্ কিন্তু ইসলামিক জীবন-যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন না, বরং তিনি নিজেকে ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষ হিসেবে সব জায়গায় উপস্থাপন করতেন। রাজনৈতিক কারণে তার মুসলমানদের নিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করা হলেও তাকে পেয়ে লাভবান হয়েছিল আলাদা মুসলিম রাষ্ট্রের দাবিদার মুসলিম লীগের নেতারা। অন্যদিকে হিন্দু রাষ্ট্রের দাবিদার নেহেরুরাও খুশী হয়েছে, কারণ তাদের দাবিও ছিলো আলাদা হিন্দু রাষ্ট্র। পরবর্তীতে বৃটিশরা এই দুই পক্ষের দাবি মেনে দুটো আলাদা রাষ্ট্র করলেও সম্পূর্ণ ভারতবর্ষকে একটি রাষ্ট্র করে হিন্দু-মুসলিমের সমন্বয়ে অবিভক্ত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখা মহত্মা গান্ধী সবচে ব্যাথিত হয়েছিলো।

আর এই হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রুপরেখা দেখানো কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের এই নেহরু আর জিন্নাদের রোষানলের পড়ে ঘৃণার বীজ এমনভাবে পড়ে যে লাখ লাখ হিন্দু আর মুসলিম দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় নিহত হয়। এদের ঘৃণা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে মুসলিম প্রধান এলাকায় হিন্দুদের দেখামাত্র হত্যা করা হতো আর হিন্দু প্রধান এলাকায় মুসলমানদের দেখামাত্র হত্যা করা হতো। সত্যি বলতে সেই হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ এখনো উত্তরাধিকারীসূত্রে আমাদের এই উপমহাদেশ বহন করে যাচ্ছে। এখনও মুসলিমপ্রধান এলাকায় মুসলিম পরিবারগুলোতে হিন্দুদের ঘৃণা করার রীতি চলছে, হিন্দুপ্রধান এলাকায় হিন্দুদের পরিবারে মুসলমানদের ঘৃণা করার রীতি চলে আসছে।

কবি ইকবালের মতোই শিয়ালকোটের ছেলে ছিলো কুলদীপ নায়ার। প্রথম আলোর কল্যাণে এই দেশেও পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠা কুলদীপ নায়ার মূলত ভারতের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের একজন। তৎকালীন বৃটিশ ভারতের শিয়ালকোটে তার বেড়ে ওঠা। দেশভাগের ফলস্বরুপ শতকরা ৬০ ভাগ মুসলিমদের দখলে থাকা শিয়ালকোট ছেড়ে অজানা উদ্দেশ্যে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে এক পারিবারিক বন্ধুর সহায়তায় বর্তমান ভারতের দিকে পালাতে হয় তাকেও। এখনো সুযোগ পেলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে দেশভাগের ফলে সৃষ্ট হৃদয় ক্ষতের কথা বলে বেড়ান নিজের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হওয়া কুলদীপ নায়ার। অথচ ভারত আর পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র ঘটনের সময় দুটো রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়া নেহরু আর জিন্নাহ্ দুজনেই বলেছিলেন তাদের দেশে ভিন্ন ধর্মালম্বীরা নিরাপদে থাকবে, ধর্ম ভিন্ন হলেও দেশ সবার একই হবে!

ধর্ম দিয়ে মানচিত্রে কাঁচি চালিয়েও রাজনীতিকদের স্বভাবসুলভ আশ্বাসের মতোই ভারত আর পাকিস্তানের প্রথম দুই রাষ্ট্রনায়ক নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণে ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে পড়ে। ভারতের সংবিধান লিখতে দেয় হয় দলিত সম্প্রদায়ের ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। পাকিস্তানের জিন্নাহ্ বেচে নিলেন পতাকাকে। পতাকার গাঢ় সবুজ অংশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতীক এবং খাড়া সাদা অংশটি পাকিস্তানের ধর্মীয় সংখ্যলঘুদের প্রতীক। মধ্যভাগে উদীয়মান চাঁদ অগ্রগতির প্রতীক এবং পাঁচ কোনবিশিষ্ট সাদা তারকাটির পাঁচটি কোন হলো ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের প্রতীক।

পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরও অনেকদিন নিজস্ব সংবিধান ছিলো না। ছিলো না জাতীয় সংগীতও। নিজেদের ইসলামিক স্টেট হিসেবে অফিসিয়ালি ঘোষণা করে ১৯৫৬ সালে। রাষ্ট্রেকে জিন্নাহ্-র ধর্মনিরপেক্ষ থেকে ইসলামী স্টেটে ঘোষণার আগে জাতীয় সংগীত নিয়েও ধর্ম-অধর্ম খেলা হয়। দেশভাগের পরপরই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ লাহোরের হিন্দু কবি জগন্নাথ আজাদকে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত লেখার জন্য বলেন। উদ্দেশ্য, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রমাণ দেয়া। জগন্নাথ আজাদের লেখা সংগীত আঠারো মাস জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এর মাঝে জিন্নাহ্-র মৃত্যু হয়। ডানপন্থী শাসকরা জগন্নাথের লেখাকে জাতীয় সংগীত রাখবে। জাতীয় সংগীত কমিটি করে পরে ছয় বছর সময় নিয়ে 'পাক সার জমিন সাদ বাদ'-কে জাতীয় সংগীত করা হয়।

ধর্মনিরপেক্ষতার চাদর উঠিয়ে দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র হওয়ার আগেই পাকিস্তানজুড়ে অসন্তোষের স্বীকার হতে থাকে রাষ্ট্র। বেশি করে আঘাত আসছিলো পূর্ব পাকিস্তান থেকে। অথচ পাকিস্তান সৃষ্টির মূল কারিগর প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগের সৃষ্টিই পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকাতে। ১৯০৬ সালে।অনেকই হয়তো জানে না, মুসলিম লীগ গঠিত হয় ঢাকার শাহবাগে নবাব সলিমুল্লাহ্-র তত্ত্বাবধানে। তখন নাম ছিলো অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ। আর মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রপুঞ্জ গঠনের প্রস্তাবটা প্রথম লাহোরে তুলে ধরেন এই পূর্ব বাংলার সন্তান শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।

ধর্মটাও সাইনবোর্ড হিসেবে বেশিদিন ধরে রাখতে পারিনি। দেশভাগের চব্বিশ বছরের মাথায় পূর্ব পাকিস্তান অংশও আলাদা হয়ে যায়, বাংলাদেশ হয় এর নাম। মজার ব্যাপার হলো, এই পূর্ব বাংলার নেতাদের প্রায়ই জেলে পুরে রাখা হতো তাদের স্বায়ত্বশাসন আর ন্যায্য পাওয়া চাওয়ার কারণে। একটা সাধারণ পরিসংখ্যান দিলেই বোঝা যায়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর, আর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত মোট চব্বিশ বছরের বারো বছরই পূর্ব পাকিস্তানের মুখপাত্র হয়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে জেলে কাটাতে হয়।

শুধু ধর্মকে সাইনবোর্ড বানিয়ে একটা রাষ্ট্র আলাদা করার মাথা মোটা চিন্তা সফল না হওয়াতে পাকিস্তানে এখনো চলছে আন্তর্কলহ আর বিভাজন। বেলুচিস্তান স্বাধীনতা চায়। আফগান সীমান্তের বড় একটা অংশ দখল করে রেখেছে তালেবানরা, যেখানে পাকিস্তান সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। একের পর এক হামলায় জর্জরিত সেদেশ। আরেকটা মজার ব্যাপার হলো তারা ১৪ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে, কিন্তু প্রথম যখন আলাদা হলো, মানে ১৯৪৭ সালে তাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে বলা হয় ১৫ আগষ্ট! পরের বছর ডাকটিকিটসহ সব সরকারী কাগজপত্রে ১৪ আগষ্টকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করা হয়।

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আলাদা হলেও পাকিস্তানী চিন্তার কিছু ভূত আমাদের দেশের কিছু মানুষের মাথায়ও রয়ে গেছে। এই যেমন, সাইনবোর্ড সর্বস্ব হলেও অনেকে দাবি করে বসে বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হোক, ১৯৭৫ সালে খন্দকার মুশতাক ক্ষমতায় অাসা মাত্র মেজর ডালিম রেডিওতে বাংলাদেশকে পিপলস্ রিপাবলিক অব বাংলাদেশ না বলে, ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ বলে ঘোষণা শুরু করে। তবে অবশ্য মুশতাক সরকার পরবর্তীতে এ নিয়ে কোন কথা বাড়ায়নি। এর আগে সৌদি বাদশা বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক স্টেট করতে অনুরোধ করে, তখন বঙ্গবন্ধু প্রতিউত্তরে যুদ্ধবাজ বাদশা সৌদের নামের দেশের নাম রাখা রাষ্ট্রকে এদেশ নিয়ে মাথা ঘামাতে নিষেধ করে দেয়। জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথের মতো হিন্দু কেন লিখলো, সে কারণে এই জাতীয় সংগীত বাতিল করে মুসলিম কারো গানকে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করে। আবার, জাতির পিতা প্রশ্ন এলে অনেকে বলে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ), শেখ মুজিব আবার কে? কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জাতীয় মাতা কাকে অফিসিয়ালি বলা? মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্-র বোন ফাতেমা জিন্নাহ-কে।

ইসলাম এমন কোন ধর্ম না যে অন্য ধর্মালম্বীকে ঘৃণা করতে বলা হয়েছে। তারপরও অপব্যাখ্যা আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার নিয়ে পাকিস্তানী রাজনীতিকরা ইসলামকে সাইনবোর্ড বানিয়ে নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। আমাদের দেশেও অনেকে ইসলামকে সাইনবোর্ড বানিয়ে নিজেদের অন্যায় আর অত্যাচারগুলো হালাল করতে চায়। ধর্মকে মেজর ফ্যাক্টর বানিয়ে ভোট নিয়ে সবাই-ই রাজনীতি করতে চায়, কিন্তু এই দেশ দেশ ভাগের পর ভিটেমাটি হারানোর বেদনা নিয়ে কোটি কোটি মানুষ নিজেদের দেশ ছাড়লো, এখনো সেই জিন্নাহ-নেহরুদের পাপ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে উপমহাদেশের হাজারো হিন্দু-মুসলিম পরিবারকে।

উগ্রপন্থীদের দেখানো স্বপ্নে শুধু ভৌগলিক অবস্থান কেন ভাগ হবে ধর্মের ভিত্তিতে। জন্মগত প্রাপ্ত এক ধর্মের কারণে কেন বয়ে বেড়াতে হবে নিজ জন্মভূমিতে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে? কেন বিসর্জন দিতে হবে নিজের ভিটেমাটি? কোন ধর্ম কি কাউকে ঘরছাড়া করতে বলেছে অন্য কারো অন্য ধর্ম আলাদা হয়েছে বলে?

প্রথমে বলেছিলাম কবি আল্লামা ইকবালের কথা। জিন্নাহ্ ছাড়াও আরেকজন ছিলো কবি আল্লামা ইকবালের প্রচন্ড ভক্ত। তিনি আল্লামা ইকবালের স্নেহধন্য সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী। চিনতে পারছেন? ইনি পাকিস্তানপন্থী খ্যাত অতিবিখ্যাত রাজনীতিক দল জামায়েত ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা, যাকে উগ্রবাদের কারণে ফাঁসির দন্ডাদেশ দেয়া হয় তৎকালীন পাকিস্তানে!

বাই দ্যা ওয়ে, আজ ১৪-ই আগষ্ট। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী!

Monday 13 June 2016

সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়া কেন জনপ্রিয় ছিলো?

আজকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুদিবস। এক পরিচিত ভাইয়ের প্রশ্ন ছিলো জিয়া কেন জনপ্রিয়তা পাইছিলো। তার উত্তর দিতে গিয়ে একটা বড় লেখা লিখে ফেলছি গত আধা ঘন্টায়! এগুলো লিখছিলাম। চাইলে পড়তে পারেনঃ

১. জিয়া ব্যাক্তিগতভাবে সৎ ও কঠোর ছিলো।

২. সে যুদ্ধবিধ্বস্ত, প্রাকৃতিক দূর্যোগ আর রাজনৈতিক দূর্যোগ বিধ্বস্ত একটা দেশের হাল ধরে তখন খাওয়ার কষ্টটা দূর করতে পারছে। পাশাপাশি মিডল-ইস্টে বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে।

৩. খালকাটা কর্মসূচী ব্যাপক সাড়া ফেলছিলো। একটা প্রেসিডেন্ট নিজে খাল কাঁটতেছে, এটা দেখেই অনেক মানুষ তার প্রেমে পড়ে গেছে। (যেটা জনগণ জানতো না সেটা হলো জিয়া প্রথম দিকে বক্তৃতা দেয়ায় আনাড়ী ছিলো, সেটা ঘুঁচতে তাকে তার রাজনৈতিক উপদেষ্টারা এমন কিছু করাতে চেয়েছে যাতে সে জনগণের কাছে যেতে পারে। তার খালাকাটা কর্মসূচীটা মূলত ওই চিন্তারই প্রোডাক্ট।)

৪. জিয়া সামরিক বাহিনীর লোক, সে একটানা প্রচুর হাঁটতে পারতো। তার এক সাবেক রাজনৈতিক সহকর্মীরই এক ইন্টারভিউতে বলতে দেখেছি যে জিয়া প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অনেক এলাকা হেঁটেছেন আর জনগণের সাথে হাত মিলিয়ে খোঁজ খবর নিতেন। এদেশের মানুষ অল্পতেই তুষ্ট। আপনার প্রশাসনিক সাফল্য আর সততার চেয়ে এসব আবেগী কাজের দাম বেশি দেয়। একারণেই এটা ব্যাপক প্রচার হয় আর এমন কাজ বঙ্গবন্ধু পরবর্তী আর কোন সরকারপ্রধানই করেনি। সে সূত্রে জিয়ার জনপ্রিয়তা আসাটা স্বাভাবিক।

৫. (একটু ইতিহাস টেনে এনে লম্বা করে বলছি)
শুনতে খারাপ দেখালেও এটা সত্য যে এদেশের জনসংখ্যার বড় একটা অংশ পাকিস্থানপন্থী। এটা অনেকের ইচ্ছাকৃত পাকিস্থানপন্থা বেছে নেয়ার মতো না। ৪৭'এ দেশ ভাগের সময় পাকিস্তান-ভারত দুভাগের সময়ই এদের মাথায় ডুকে যায় যে পাকিস্তান হলো মুসলিম রাষ্ট্র, একমাত্র মুসলিমরা শাসন করবে। কিন্তু জিন্নাহদের এই মুসলিমদের শাসন কনসেপ্টের কারণেই বর্তমান বাংলাদেশ বা তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের সাথে বাঙ্গালি মুসলমানদের মিলেমিশে থাকাটা তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতাদের চোখের বিষ হয়ে উঠেছিলো। তাই তখন খুব অপপ্রচার হতো যে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা প্রকৃত মুসলমান না, তারা মনে মনে হিন্দু। পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ শিক্ষক হিন্দু, অতএব ওখানে সঠিকভাবে মুসলমান পয়দা হয় না। সংস্কৃতিক পার্থক্য তো ছিলোই তাদের সাথে, তাই এখানকার কালচারকে তারা হিন্দু কালচার হিসেবে প্রচার করে আর ধার্মিক মুসলমানদের জন্য ওসব হারাম দেখিয়ে তারা ন্যায্য পাওয়াগুলো থেকেও বঞ্চিত করতো। তাই একসময় পাকিস্থানিরা এখানকার হিন্দু-মুসলিম সবার উপর অ্যাটাক করে, যুদ্ধে হত্যা-ধর্ষণকে ডিফেন্ড করে এই বলে যে এদেশের মানুষ পাক-পবিত্র ইসলামী রাষ্ট্র চায় না তাই যুদ্ধে নেমেছে। রাষ্ট্র বিরোধী হিসেবে তাদের হত্যা করা জায়েজ আর তাদের নারীদের ধর্ষণ করাও জায়েজ। (গুল হাসান নামের এক পাকি জেনারেলের বইয়ে তাদের মানসিকতার ব্যাপারে আরো বিস্তারিত পড়েছিলাম।) যাই হোক, খেয়াল করলে দেখবেন তখন শুধু ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে নিজের মনে করে অনেকেই ওদের ওসব গুজবকে বিশ্বাস করে বা ধারণ করে অনেক বাংলাদেশীই রাজাকারী করেছিলো। অনেকের ধারণা তারা ধর্ম ও রাষ্ট্রের জন্য বড় কিছু করছে, তাই অনেক রাজাকারই অন্যের ঘরের মেয়ে-বউদের পাকিদের হাতে তুলে দিতে দ্বিধান্বিত হয়নি। যাই হোক, ধর্ম প্লেইড এ মেজর রোল টু বি পাকিস্তানপন্থী। তখনও সঠিকভাবে ধর্মকে না জেনে শুধু নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য ধর্মকে অস্ত্র বানানোর লোক ছিলো, যুুদ্ধের বছর দশেক পর (জিয়ার শাসনামলেও) ছিলো, এখনও আছে।

জিয়া তখন অনেক পাকিস্থানপন্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। শাহ আজীজের মতো রাজাকারকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলো। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাটার সাথে সাথে রাজাকারদেরও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞাটা উঠিয়ে নিয়েছিলো। এতে মূলত মুসলীম লীগপন্থীরা খুশী হয়েছিলো।

সংবিধানে বিসমিল্লাহ্ সংযোজন করাতে মুসলামনরা খুশী হয়েছিল। আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে খুশী করতে পেরেছিলো, যদিও এতে জনগণের কোন লাভ হয়নি তবে এক প্রকার নেতারা হিন্দুদের ঘরবাড়ী দখল করতে বা তাদের উপর অত্যাচার করার সুযোগটা বেশি করে পেয়ে বসেছিল। (হিন্দুদের ঘরবাড়ী আগে-পরে দখল হয়েছে , তবে কাগজে কলমে হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর জনগণ হিসেবে পরোক্ষ স্বীকৃতি তখনই চলে এসেছিলো)। আরেকটা জিনিস হলো, পাকিস্তান আমলের মুসলিম লীগের অনেক নেতা বিএনপিতে ঢুকে পড়েছিলো পরবর্তীতে। আর সেনাবাহিনীতে পাকিস্তানফেরত আর্মি অফিসারদের গুরুত্ব দেয়ার কারণেই মূলত জিয়া তার একসময়ের মুক্তিযোদ্ধ সহকর্মীদের রোষানলে পড়তে হয়েছিলো আর তার সুযোগ নিয়েই বাহিনীর চট্টগ্রামের একটা অংশের লোক তাকে হত্যা করে। মৃত্যুর প্রায় দশবছর পরও তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলো, যদিও আমার ধারণা নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া কোন জাতেরই না। বরং বর্তমান বিএনপির দুর্দশার জন্য খালেদা জিয়ার অদূরদর্শীতারও বড় রকমের দায়ী।

(মেজর জিয়ার ব্যাপারে একটা মজার ব্যাপার হলো জিয়া ভালো করে বাংলা লিখতে বা পড়তে জানতো না। পড়াশোনার জন্য বেশির ভাগ সময়ই পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সাক্ষরেও জিয়াউর রহমান না লিখে শুধু জিয়া লিখতেন। যদিও তার ডাক নাম কমল। আর প্রশাসক হিসেবে প্রায় সফল বলা গেলেও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কর্ণেল তাহেরকে ফাঁসিসহ অনেক সেনা সদস্যকে হত্যার জন্য তাকে দায়ী করা হয়। মানে যতটা দুধে ধোঁয়া তুলসি পাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় ততটা না। তবে সে যে দূরদর্শী আর ভাল প্রশাসক ছিলো তা অনস্বীকার্য।)

৩১ মে, ২০‌১৬
উত্তরা, ঢাকা। 

Wednesday 11 May 2016

এতো শহীদ আর বীরঙ্গনার দেশে চলচিত্রের মৌলিক কাহিনীর সংকট!

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মার্চের ১৬/১৭ তারিখ যুক্তরাষ্ট্র জাপানের কোবে কুখ্যাত 'বোম্বিং অব কোব' নামের বোমা হামলা চালালে সাধারণ জনগণের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষের বাড়ী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় আর দশ লাখ মানুষের বাড়ী আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এমনি একটি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের ছেলে ছিলো একিইউকি নোসাকা। ওই বোমা হামলায় তার পিতা মারা যায়, দুই বোন মারা যায় অসুস্থতায় আর অপুষ্টিতে। চারপাশে পুঁড়ে যাওয়া ঘরবাড়ী, চোখের সামনে অপুষ্টিতে মরে যাওয়া মানুষগুলোর কথা ভুলে যায়নি সে। পরবর্তীতে সেই দুঃসহ বেদনার দিনগুলোর ছায়া অবলম্বন করে রচনা করে ছোটগল্প 'গ্রেভ অব দ্যা ফায়ারফ্লাইস্' বা 'জোনাকিদের কবর'। এই লেখক যুদ্ধ আর যুদ্ধশিশুদের নিয়ে লেখার জন্য বেশ বিখ্যাত ছিলেন। 'গ্রেভ অব দ্যা ফায়ারফ্লাইস্' নামের ছোটগল্পটাই পরে অ্যানিমেটেড মুভী (অ্যানিম) আকারে প্রকাশ হলে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সাড়া পায় আর এই গল্প নিয়েই মানুষজনের (বিশেষ করে অ্যানিম প্রিয় শিশু-কিশোরদের) এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জানার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।

'Saving Private Ryan','Band of Brothers','The Pacific','The Thin Red Line','The Big Red One','The Bridge'-সহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে নির্মিত মুভী বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তুলে। এগুলো শুধুই মুভী বললে ভুল হবে, নতুন প্রজন্মের কাছে যুদ্ধের ব্যাপক ভয়াবহতা তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে, দেশভাগ নিয়ে প্রচুর বই আছে। সবগুলো উল্লেখ না করলেও শুধু ওপার বাংলার নামী-দামী লেখকদের অনেক গল্প-উপন্যাসই বয়ে বেড়ায় দেশভাগের কষ্টের তীব্র হাহাকার। 'মেঘে ঢাকা তারা', 'শঙ্খচিল' আর হালের 'রাজকাহিনী'-র মতো চলচিত্রগুলো মূল পটভূমিই তো ১৯৪৭-এর দেশভাগ। মজার ব্যাপার হলো ইন্ডিয়ার কিছু মুভীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে উপস্থাপন করা হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের অংশ হিসেবে!

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর বই রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধারা লিখে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে রেফারেন্স বইয়েরও অভাব নেই। এক জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি' বইয়েই ঢাকা শহরে যুদ্ধের ভয়াবহতা আর পাকি আর্মি শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতনের বর্ণনা আছে। যুদ্ধের ময়দানে বসে লেখা আনোয়ার পাশার উপন্যাস 'রাইফেল, রোটি, আওরাত' আছে। নীলিমা ইব্রাহিমের 'আমি বীরঙ্গনা বলছি', মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়ার 'জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা'-তে আছে যুদ্ধে তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, সম্মুখ সমরযুদ্ধের বর্ণনা নিয়ে কম করে হলেও হাজার খানেকের উপর বই আছে। মুক্তিযুদ্ধের অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় এসেছে ওইসময়কার পাকিস্থানপন্থী রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের কর্মকান্ডের বর্ণনা। আমরা এ প্রজন্মের অনেকের মুক্তিযুদ্ধের গল্প প্রথম পড়া হয় হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল আর আনিসুল হকদের বই দিয়ে। মুনতাসির মামুন আর অমি রহমান পিয়ালরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একদম নগদে বাঁচিয়ে রাখার কাজ করছে এখনো। এক কথায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প আর ইতিহাস বইয়ের ভান্ডার অনেক সমৃদ্ধ।

আমাদের দেশের চলচিত্র নির্মাতারা নাকি ভালো গল্প পায় না। ভালো গল্পের অভাবে নাদুস-নুদুস একঘেয়ে প্রেমের বস্তাপঁচা মুভী বানাতে নাকি বাধ্য হয়। তার উপর আছে ইন্ডিয়ান মুভীর গল্প চুরি করে বাংলা ছবি বানানোর হিড়িক। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে 'ওরা এগারো জন', 'আমার বন্ধু রাশেদ' বা 'গেরিলা'-র মতো হাতে গোণা কয়েকটা চলচিত্র ছাড়া তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ছবি তৈরী হয়নি। ওপার বাংলায় যেখানে ইতিহাস আর উপন্যাস অবলম্বনে বছরে কম করে হলেও নয়-দশটা ভালো মুভী তৈরী হয় সেখানে আমাদের চলচিত্রকাররা গল্প খুঁজে পায় না।

জাতি হিসেবে মোটা দাগে ইতিহাসের বইয়ে লিখে রাখার মতো বৃটিশ শাসন বিরোধী আন্দোলন, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅদ্ভূত্থান, ১৯৭১'এর মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ে এরশাদ বিরোধী তীব্র ছাত্র-আন্দোলন রয়েছে। ওসব আন্দোলনে ঝরে গেছে অনেক প্রাণ, নিঃস্ব হয়েছে অনেক পরিবার। ওসব পরিবার নিয়ে কি ভালো গল্প হয় না? মন ছুঁয়ে যাওয়া কাহিনী কি নেই?!

আমার এক পিচ্ছি কাজিন প্রাইমারী লেভেলে টার্ম পরীক্ষা দিচ্ছিলো। পাশের সিটে বসা এক ছেলে ওর খাতায় যা ছিলো সব হুবুহু লিখে দিয়েছে। পরীক্ষার কপি পরে যখন শিক্ষিকা ডিসস্ট্রিবিউট করছিলো তখন দেখে আমার কাজিনের নামের কপি দুইটা! যে ছেলে কপি করছিলো সে খাতায় নিজের নাম-রোলও কপি করে দিয়েছে।

আমাদের মিডিয়ায় ইন্ডিয়ার সবকিছুই অন্ধের মতো কপি করার প্রবণতা আছে। সিরিয়াল, মিউজিক ভিডিও, টিভিসি, মুভী সবই। নিজস্বতার জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছে। ইন্ডিয়ান মিডিয়ায় যেভাবে বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের কৃতিত্বতে ভাগ বসানোর প্রবণতা আছে, তাতে না জানি আমাদের মিডিয়াও পরীক্ষার খাতায় অন্যের নাম-রোলসহ কপি করার মতো নিজেদের কৃতিত্ব ইন্ডিয়ানদের দিয়ে বসে!

আর বইবিমুখ নয়া প্রজন্মের জন্য কি 'গ্রেভ অব দ্যা ফায়ারফ্লাইস্' এর মতো আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা গল্পগুলো থেকে মুভী বানানো যায় না?
তাতে অন্তত কোন পাকিস্থানপন্থী রাজাকারগুলোর ছড়ানো মিথ্যের শিকড় আস্তে আস্তে নয়াপ্রজন্মকে গ্রাস করা থেকে দূরে রাখতে পারবে। শিশু-কিশোররাও মুভী-অ্যানিমেশন দেখে আগ্রহী হবে দেশের ইতিহাস জানতে।

Friday 6 May 2016

অাধুনিক শ্রেণীবৈষম্য


চৌধুরী এর 'চৌ' এর অর্থ চার আর 'ধুরী' মানে ধরে রাখা/বহন করা। মূলত চৌধুরী তারাই যারা হিন্দু ধর্মের চার বর্ণেই (বাক্ষ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) একসাথে ধারণ করে। মুঘল আমলে মুসলিম শাসকরা নিজেদের সবধরণের জনগণের প্রতিনিধি প্রমাণে এই টাইটেল গ্রহণ করে। তালুকদার তাদের বলা হতো যারা মুঘল আর বৃটিশ আমলে জমির মালিক ছিলো। মজুমদার তারা যারা রাজস্বের হিসেব রাখতো। ভূঁইয়ারা ছিলো সুলতানি আমলে এই অঞ্চলের জমির মালিক কাম শাসক। শেখ টাইটেল যাদের ছিলো মূলত তাদের পূর্বসূরীরা এই অঞ্চলে ইসলামের প্রচারের জন্য আরব থেকে এসেছিলো।

বৃটিশরা যখন সিরাজোদ্দৌলাকে মীর জাফরদের বেঈমানীর কারণে সহজে পরাজিত করে এই অঞ্চলে ক্ষমতা দখল করে শোষণ শুরু করে তখন থেকেই এই অঞ্চলে 'মীর জাফর' নামটাকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়, পারতপক্ষে কেউ জেনে শুনে নিজের সন্তানের নাম মীর জাফর রাখার সাহস করে না। আমাদের বেঈমানদের গালাগালির সুবিধার্থে দুটো শব্দ খুব বেশি ব্যবহার করি। একটা এই 'মীরজাফর' আর আরেকটা 'রাজাকার'। মীরজাফরের তুলনায় রাজাকার গালিটায় তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই ঘটায়। এক অর্থে চিন্তা করলে মীরজাফর একটা রাজাকার ছিলো। তবে রাজাকারকূলের শিরোমনি গোলাম আজমের জনপ্রিয়তা খুব যে খারাপ ছিলো বা আছে তার জন্য তার নামে আরো শ' কিংবা হাজার খানেক বাংলাদেশী থাকাটা বিস্ময়ের কিছু নয়।

সত্তরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান বা এই বাংলায় জামাতের একটা আসন বাদে কোন তীব্র পাকিস্তানপন্থী কোন দল একটা আসনও না জিতলেও বিহারী আর কিছু সাচ্চা পাক-পাকিস্তানিদের সহায়তায় পাকিস্তানপন্থীদের ভোটের হার একদমই কম ছিলো না। সে হিসেবে হাজারখানেক গোলাম আজম এদেশে থাকাটাই স্বাভাবিক।

মূল কথায় আসি, এই যে চৌধুরী, তালুকদার, ভূঁইয়া, শেখ কিংবা কাজী বংশ নিয়ে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এতো মাতামাতি হয় কিন্তু ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায় এই টাইটেলের লোকগুলোই তৎকালীন বৃটিশ শাসকদের প্রধান চামচা ছিলো। এরা নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখার জন্য বৃটিশ শোষকদের চরণ ধুঁয়ে নিজ দেশের জনগণের উপর প্রচন্ড রকমের অত্যাচার করতো। খাজনা নেওয়া নিয়ে কঠোরতার চূড়ান্তরূপ দেখাতেও তাদের গা কাঁপতো না। ওইসময়কার ইতিহাস আর গল্প-উপন্যাসে দেশী শাসকদের সহায়তা বৃটিশদের শোষণের চিত্র খুব স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। এজন্য বলা যায় এরাও আসলে একপ্রকারের রাজকার ছিলো। কিন্তু ভাগ্য এই সুপ্রসন্ন যে বৃটিশরা চলে যাওয়ার পর এমন শোষকদের কেউ বিচারের দাবি তুলেনি। স্বাধীন দুই রাষ্ট্রে 'জয় হিন্দ' আর 'পাকসার জমিন সাদবাদ' করে এরাই কিংবা এদের উত্তরসূরীরাই বিভিন্ন অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছিলো।

একটা মজার ব্যাপার হলো দেশভাগের নামে যে দুটো আলাদা রাষ্ট্র হলো, সেই রাষ্ট্রগুলোর পূর্ববর্তী কোন একক রাষ্ট্র ছিলো? ছিলো না। বৃটিশ সাম্রাজ্যের আগে বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা শাসন ছিলো। আর ভারত ছিলো মহাভারতে উল্লেখিত 'আসমুদ্র হীমাচল' মানে হীমাচল থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত একটা সাম্রাজ্য যার আসলেই ঐতিহাসিক কোন শক্ত কোন ভীত্তি নেই। যাই হোক, ভারত রাষ্ট্র হয়ে তাদের সংবিধান লিখতে দিলো অচ্ছুত বর্ণের বা শ্রেণীহীন দলিত হিন্দুদের প্রতিনিধি বি আর আম্বেদকারকে (পরবর্তীদে বুদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেয়), আর প্রমাণ করলো এই ভারত সকল শ্রেণীর আর মানুষের জন্য। পাক জমির পাকিস্তান তো ততদিনে একটা সংবিধান বানাতেও হিমশিম খেতে খেতে শেষ। মুখে দুই রাষ্ট্রের এক কথা, সব শ্রেণীর মানুষের সমান অধিকার। কাজে কর্মে জনগণই সেটা বিশ্বাস করতো না, বরং যে যেভাবে পেরেছে নিজেদের নামের পাশে চৌধুরী, তালুকদার, কাজী, ভূঁইয়া প্রভৃতি টাইটেল লাগিয়ে শ্রেণীসম্পন্ন মানুষে পরিণত করেছে। দেশভাগের পর এপারের অনেক মানুষ ওপারে গেলো, ওপারের অনেকেই এপারে এলো। বিহার থেকে বিহারী এলো। তারপরও মনেপ্রাণে সবাই একই জাতিসত্তা গ্রহণ করতে পারলো না। পাক সার জমিন বাদ হয়ে একপ্রান্তে লাল সবুজের বাংলাদেশের জন্ম হলো, আরেকপ্রান্ত তার সেই প্রতিপত্তি হারালেও পাকিস্তান নাম নিয়েই বেঁচে আছে। তবে এখনো মানুষগুলো বদলায়নি। এখনো মানুষজন তাদের জাতিসত্তাগুলো সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে পারেনি। এখনো একটা তামিল পরিবার একটা বাঙ্গালি কিংবা একটা মারাঠী পরিবারের সাথে নতুন সম্পর্কে যেতে দু'চারবার ভাবে। ভারতীয় সত্তা ধারণ করতে না পারায় তাদের 'কমন' কালচার বলতে বলিউডই আছে। কিন্তু সবাই নিজ নিজ সংস্কৃতি আর চিন্তা চেতনায় পড়ে আছে। তাইতো 'টু স্টেটস্' এর মতো মুভী কিংবা বই লিখে মনেপ্রাণে ভারতীয় হয়ে ওঠার জন্য লেখককে উৎসাহ দিতে হয়।

 বাঙ্গালী বাংলাদেশী একক জাতিসত্তার এই বাংলায় তো অবস্থা আরো করুণ। এক পরিবারের সাথে আরেক পরিবারের সম্পর্ক করার আগে যা যা দেখতে হয়ঃ
১. ধর্ম এক কি না।
২. এলাকা এক কি না। (নোয়াখাইল্লা-বরিশাইল্লা বাছবিচার)
৩. সংস্কৃতিমনা উদার নাকি রক্ষণশীল মুসলিম/ধার্মিক কি না (হালের লোক দেখানো ট্রেন্ডী হাজী মুসলিম পরিবার চায় আরেকটা ধার্মিক পরিবার আর উদারমনা দাবিদাররা চায় তাদের মতো)
৪. পরিবারের টাইটেল উঁচু কি না (বংশ মর্যাদার লেভেল টাইটেলে বিদ্যমান অনেকাংশেই)
৫. পূর্বপুরুষরা এই বাংলার নাকি ওই বাংলা বা ভারত থেকে আগত ছিলো কি না (মানে অনেকের মতে দাদা-বাবারা এই বাংলায় জন্মসূত্রে বসবাসকারী না হলে সহীহ বাংলাদেশী বলা যাবে না! :3 )
৬. শিক্ষা (সার্টিফিকেট দেখানোর মতো হলেই হবে)
৭. ৮. ৯. .... ৯৯. (অর্থ সংশ্লিষ্টবিষয়াদীসহ বিস্তারিত গবেষণা।)

মূলত এই যে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে গর্ব করে অ্যাডভান্টেজটা নেই, তাদের কর্মকান্ড কি আসলেই গর্ব করার মতো কিছু ছিলো কি না তা অনেক বেশি প্রশ্নসাপেক্ষ, তবে মনমানসিকতায় আমরা এখনো শ্রেণীবৈষম্য পুষে বেড়াই। একটা রাষ্ট্র যেখানে সবার অধিকার সমান হওয়ার কথা, সবার সুযোগ সুবিধা সমান হওয়ার কথা.. সেখানে রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই দখল দখল করে নিজেই খব সাবাড় করে শ্রেণীযুক্ত হয়ে লুটপাট করে যে যেভাবে পেরেছে উঁচুশ্রেণীর মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগীতায় নেমেছে। যেখানে সবাই সবার সহযোগীতার মাধ্যমে সমান হওয়ার কথা সেখানে সেই আমরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রশাসনকে গালি দেই। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বৃটিশ তাড়ানো থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যারা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে তারা অযথাই জীবনগুলো সেক্রিফাইস করেছে। যাদের সেক্রিফাইসের ফলে লুটেরা-রা আরও বেশি লুট করার সুযোগ পেয়ে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, তাদের জন্য এসব সেক্রিফাইসের কোন দরকার ছিলো না। একশ-দুইশ বছর আগে যারা ভাবতো বৃটিশরা চলে গেলে আমরা সবাই শান্তিতে থাকবো তারা আসলেই বোকা ছিলো, যারা পঞ্চাশ বছর আগে ভাবতো পাকিরা চলে গেলে আমরা শান্তিতে থাকবো তারাও বোকা ছিলো। আসলে আমরা মনের কলুষতা দূর না করে সবাই এক একজন চৌধুরী, তালুকদার, ভূইয়া প্রভৃতি হয়ে বাঁচতে চাই। এখানেই মূল সমস্যা। আমরা কেউ বাংলাদেশী হতে চাই না। মনে প্রাণে একদমই হতে চাই না।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যদি ব্যর্থ হয় তবে ব্যর্থতার জন্য আমাদের মানসিকতাই দায়ী।

Thursday 5 May 2016

রিভিউঃ আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে

কিউবার মতো আমেরিকার নাকের ডগায় থাকা একটা দেশ স্পেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সাহায্য পায় আমেরিকার। তারপর? বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদী আমেরিকা দখল করে কিউবার অর্থনীতি। পুতুল সরকার বসিয়ে কিউবার সম্পদ অাহরণ বেশ ভালোভাবেই করছিলো। এক স্পেনিশ বাবা আর কিউবান মায়ের ঘরে জন্ম হয় ক্যাস্ট্রোর.. ফিদেল ক্যাস্ট্রো। শৈশবেই প্রথা অনুযায়ী পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বাবা-মায়ের থেকে দূরে পাঠানো, তারপর একসময় বোর্ডিং স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে রাজনীতিতে পা। পুঁজিবাদে বড়ই অনাস্থা। নিজের ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোকে সাথে নিয়ে গেরিলা দল বানিয়ে সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, সামরিক বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে বন্দী জীবন, মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে আসা, জীবন বাঁচাতে মেক্সিকো গমন, চে গুয়েভারার সান্নিধ্য, একসাথে কিউবায় আক্রমণ, চূড়ান্ত বিজয়, আমেরিকার সাথে স্বল্পশক্তি নিয়েও যুদ্ধে প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার স্বত্তেও মাথা উঁচু করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সোভিয়েত পতনের পরও সমাজতন্ত্র নিয়ে সফলভাবে দেশ পরিচালনা আর বিশ্বমিডিয়ায় ক্রমাগত উদ্দেশ্যমূলকভাবে খলনায়ক আর একনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের পরও কিভাবে দেশের জনগণের ভালবাসায় এখনো সিক্ত হন সে সব নিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রে গল্প করেছেন বাংলাদেশী এক তরুণের সাথে।


কাল্পনিক সাক্ষাতকার হলেও লেখক শাহাদুজ্জামান বেশ চমৎকারভাবে ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ক্যাস্ট্রোর আদর্শকে এবং জীবনীকে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। এক কথায় বইটিকে বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম সেরা ডকুফিকশনের স্বীকৃতি দিতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না!

A life lesson

প্রথমে তিনজন মানুষ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেই। NSU লাইফে ৯০% কোর্সেই আমার অ্যাসাইনম্যান্ট বা প্রজেক্টের গ্রুপে নাজিয়া গ্রুপ পার্টনার ছিলো। প্রায় প্রতি সেমিস্টারে বেশির ভাগ কোর্সই মিলিয়ে নেই যাতে অ্যাসাইমেন্ট বা প্রজেক্টের লেখার কাজগুলো ভাগ করে নেয়া যায়। ল্যাব রিপোর্ট লেখার কাজ সবসময়ই আমি এড়িয়ে যেতাম বিরক্তিকর মনে হতো দেখে আর আমার এই কাজটা নাজিয়া করে দিতো।

হাসিবুলের সাথে পরিচয়ের পর হাসিবুলও প্রায় সব কোর্সেই প্রজেক্ট বা গ্রুপ পার্টনার ছিলো। কাজের ব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য পরায়ন এবং সময়ের কাজ সময়ে করে আর আলসেমি করে না। গ্রুপের কেউ কোন কাজ না করলে তা করিয়ে নেয়ার ক্ষমতাও চমৎকার।

সাবেক ঘুমকুমার নাঈম রিদওয়ান আবীর হলো একজন অমায়িক মানুষ। যদিও আমার প্রতিবেশী তাও সে মাঝে মাঝে নিখোঁজ হয়ে যায়, কিন্তু কাজের অ্যাকুরেসি অনেক ভালো। মানুষকে যে কোন ব্যাপারে সারল্যের সাথে নিঃশর্ত সাহায্য করতে করতে তাকে আমার বন্ধুমহলের সবচে 'ইউজড্ পারসন' হতে দেখেছি। আবীর আর নাজিয়া হলো আমার প্রথম সেমিস্টার থেকেই সবচে কাছের ফ্রেন্ড, যাদের সাথে সবসময় এটা-ওটা নিয়ে গ্যাঞ্জাম লেগেই থাকে।

যাই হোক, মূল ঘটনায় আসি। ফাজি লজিকে যখন প্রথম ছয়জনের গ্রুপ ফর্ম হচ্ছিলো তখন আমি, হাসিব আর নাজিয়া একসাথে গ্রুপে থাকার কথা হয়। বাকী তিনজন আগেও পেপার পাবলিস করেছে, তাই তাদের সাথে নিতে চাওয়ায় আমরাও রাজী হয়ে যাই। কোর্সের শুরুতেই এভাবেই কথা ফাইনাল হয়। কোর্স রি-অ্যাডভাইজের পর আরো কয়েকজন কোর্সে অ্যাড হয়, যার মধ্যে আবীরও ছিলো। যাই হোক, যাদের সাথে করার কথা তাদের তিনজনের ক্লোজ ফ্রেন্ড আর আগের পেপারের গ্রুপমেট কোর্সটা রিঅ্যাডভাইজ করে নেওয়ায় আমরা ওদের অনুরোধ করার প্ল্যান করি যাতে তাদের পুরোনো পার্টনারকে নেয়, আমরা আবীরকে নিয়ে আরেকটা গ্রুপ করবো। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই পরিচিত একজন শ্রদ্ধেয় বড় ভাই (যিনি এর আগেও অনেক কোর্স আমাদের সাথে করেছেন) আমার কাছে এসে বললেন, 'জিটু তুমি নাজিয়াকে বা হাসিবকে বাদ দিয়ে ওই গ্রুপে থেকে যাও। বিশেষ করে বলছি, হাসিবকে বাদ দিলে ভালো হয়। ও কি পারে? কিচ্ছু তো করবে না!'

উল্লেখিত বিশিষ্ট বড় ভাইয়ের কথায় আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমাদের সম্পর্কে অবজ্ঞাসূচক ভাল রকমের কথাবার্তা বললেন। যাই হোক, কথা শেষ হওয়ার পর এ ব্যাপারে কিছু না জানিয়ে নিজেরাই গ্রুপ ফর্ম করলাম। কথা দিয়ে তো আর কথা ভঙ্গ করা ঠিক না, আর আমি এদের কথা দিয়ে অন্যগ্রুপেও যেতে পারি না। গ্রুপে ছিলাম আমি, হাসিব, নাজিয়া, আবীর আর সাথে সোনিয়া, ইভা। অবজ্ঞাটা খুব খারাপ লেগেছিলো, তাই বাকীদের বললাম কাজটা সিরিয়াসলি নিতে।

টপিক বেছে নেয়া থেকে শুরু করে প্রাথমিক সব কাজে হাসিব অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করেছে। কাজ করতে গিয়ে সবচে বেশি কষ্ট হয় ডাটা কালেকশনে। বারডেমে টানা পাঁচদিন গিয়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই অফিস ওই অফিস ঘুরে কোন লাভ হয়নি। শেষে বাধ্য হয়ে দুদিন সময় হাতে নিয়ে ফেনী গিয়ে ফেনী ডায়বেটিক হাসপাতাল থেকে ডাটা নিয়ে আসতে হয়েছে, সে কাজও প্রায় অসম্ভব ছিলো যদি না ডাক্তার বৈশাখী আপু আশাতিত ভাবে সাহায্য না করতো। সিস্টেম রেডী করতে গিয়ে যে অ্যালগরিদমে সাদা চোখে মনে হয়েছে কাজ হবে না তাও সেই কাজটা করে দেখেছি যাতে আমাদের কাজে কোন ছোটখাটো ভুল না থাকে। এজন্য হাসিব আর আবীর তো রীতিমত আঁটঘাঁট বেঁধে যুদ্ধে নেমে আমাকে পঁচাইছে। একদিন তো ডাটা ইনপুট করে চেক করার সময় কি এক ছোট্ট ভুলের জন্য স্টাডি হলে উত্তেজিত হয়ে টেবিল চাপড়ে হাসিব আর নাজিয়াকে কি কি যেন বলে মেজাজ খারাপ করে দিয়েছি। কাজের গুরুত্ব বুঝে আমার খারাপ ব্যবহারটা বড় করে দেখেনি তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আর আবীরকে তো অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে শেষ তিনদিন। সিস্টেমের ম্যাথমেটিক্যাল সব ক্যালকুলেশন বার বার করিয়েছি। একদিন সন্ধ্যা থেকে পরদিন দুপুর ১টা পর্যন্ত চেয়ার থেকে উঠতে দেইনি বরং আমি আর হাসিব ওকে ঝাঁড়ি মারতে মারতে নিজেরাই মাঝে দুঘন্টা করে ঘুমিয়ে নিয়েছি।

পুরো ইমপ্লিমেন্টেড সিস্টেম সম্পর্কে পেপার একবার লিখে সেটা পুরোটা বাদ দিয়ে আবার নতুন করে লিখতে হয়েছে। তবে এতকিছুর পরও সবচে ভালো লেগেছে যখন ডঃ রাশেদ স্যার বললো তোমাদের কাজ খুব ভাল হয়েছে। স্যারকে অনেক জ্বালিয়েছি, এটা ওটা নিয়ে উনাকে মেইল করে আর অফিসে গিয়ে হেল্প চেয়ে। স্যারকেও ধন্যবাদ দিয়েও শেষ করা যাবে না তার অবদানের জন্য। অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। সবচে অবাক হয়েছি যখন পেপার স্যারকে ফাইনালী জমা দেয়ার দু'সাপ্তাহ না যেতেই স্প্রিংগার কনফারেন্সের জন্য পেপার অ্যাকসেপ্টেড হওয়ায়। আসলে কেমন মানের পেপার সেখানে অ্যাকসেপ্টেড হয় সেটাও জানতাম না, স্যার যদি গুরুত্বটা না বোঝাতো। শ্রদ্ধেয় রাশেদ স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

সত্যি বলতে ভালো মানের পেপার লেখার ইচ্ছে ছিলো শুধু অবজ্ঞার জবাব দেয়ার জন্য। এমন ছোটখাটো রিসার্চ পেপার আসলে অহরহ অনেকেরই পাবলিস হয়। আমরা যে কজন কাজ করেছি হয়তো কেউই অত আহমরি স্টুডেন্ট না, তাই নাক সিঁটকানো টাইপের কথা বলে, খোঁচা মারা কথা শুনেও কিছু বলতে পারিনি। শুধু ফোকাস ধরে রেখে সিরিয়াসলি নিজেদের কাজটুকু করার চেষ্টা করেছি আর তাতে বোধকরি সফল হয়েছি। বোধকরি, এভাবে সব কোর্সে যদি প্রথম থেকে সিরিয়াসলি পড়তাম তাহলে অসাধারণ রেজাল্ট নিয়ে বের হতে পারতাম।

মূলকথা বলি, আমরা ডায়বেটিস নির্ণয় নিয়ে Fuzzy Logic ব্যবহার করে একটা সিস্টেম ইমপ্লিমেন্ট করেছিলাম। টাইটেল Application of Fuzzy Logic for Generating Interpretable Pattern for Diabetes Disease in Bangladesh. চেক প্রজাতন্ত্রের টমাস বাটা ইউনিভার্সিটির উদ্দ্যোগে অনুষ্ঠিত 5th Computer Science On-line Conference 2016-তে আমাদের পেপারটা অ্যাকসেপ্টেড হয়। আজকে প্রেজেন্টেশন ছিলো। কিছুক্ষণ আগে Springer-এ আমাদের পেপারটা Artificial Intelligence Perspectives in Intelligent Systems সিরিজে পাবলিস হলো (লিংক প্রথম কমেন্টে)। যে কেউ চাইলে ২৯.৯৫ ইউ এস ডলারে কিনে নিতে পারেন!

এটা একটা সামান্য কাজ। এত বড় করে বলার কোন ইচ্ছে ছিলো না, আর আজকের পর কখনোই এই নিয়ে কথা বলবো না। তবে অবজ্ঞার একটা ছোট্ট জবাব দেয়ার ছিলো। ধন্যবাদ সেই মানুষকে যিনি আমাদের অবজ্ঞাসূচক কথাবার্তা বলে উৎসাহ দিয়েছেন। অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ তাকে। এমন লাইফ লেসন কয়জন দিতে পারে? !

Wednesday 9 March 2016

বেদনার সুর

যে মানুষটাকে রাত-দুপুরে গালি দেই আর খুঁজে বেড়াই দোষ ত্রুটি, সেই মানুষটার কিছু গুণও আছে। তার কিছু কষ্টও আছে। আছে না বলা কিছু বেদনা। মানুষের মনের ভাষা বোঝার জন্য কাগুজে কোন বর্ণ নেই। বুকভরা হাহাকার লিপিবদ্ধের কোন শব্দ নেই। বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা যায় না বুকের মধ্যে থাকা শূন্যতা।

প্রকাশের অভাবে কত কত মানুষ আজ-ও নিজেই নিজের কবিতার কবি, নিজেই পাঠক.. নিজেই সমালোচক। যতই মানুষের ঘনিষ্ট হই, ততই তাদের বেদনার সুর কানের কাছাকাছি আসে। কষ্ট-দুঃখ-বেদনা এসব আছে বলেই প্রত্যেকটা মানুষই আপন কষ্টের বংশীবাদক, সুরটা সবার কানে যায় না। যারা পাশে গিয়ে বসে, একান্তে সময় কাটায়.. তারাই শোনে। মানুষগুলো সব দুঃখী, প্রকাশ্যে-কিংবা অপ্রকাশ্যে।

০৮/০৩/২০১৬
উত্তরা, ঢাকা।

বুক রিভিউ: বিএনপি সময়-অসময়

গত চার-পাঁচদিন বেশ সময় নিয়ে পড়ে শেষ করলাম লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের লেখা সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত 'বিএনপি : সময় অসময়' গ্রন্থটি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির গত ৩৭ বছরের উঠা-নামাই শুধু নয়, বিএনপি গঠনের প্রেক্ষাপট আর মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বিএনপি প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তারিত লেখা আছে এ বইয়ে। দশটি ভাগে ভাগ করে বিএনপির সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াসটা চমৎকার ছিলো।

'বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ'কে সরিয়ে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'কে সামনে এনে একদম ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে গড়ে উঠে বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যদিও প্রথমে 'জাগদল' আর পরে 'বিএনএফ' থেকে 'বিএনপি'তে পরিণত হয় দলটি। লেখক প্রথমেই জিয়ার মেজর থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার বর্ণনাটা খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।



একজন সামরিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে জিয়ার দুর্বল আর সবল দিকগুলো তুলে ধরে কিভাবে রাজনৈতিকদের মতো বক্তিতা দিয়ে মানুষ পটানোর ক্ষমতা না থাকার স্বত্তেও খালকাটাসহ মাইলের পর মাইল হেঁটে বিভিন্ন কর্মসূচী দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন তারও বিস্তারিত বর্ণনা বেশ আকর্ষণীয় দিক এই বইয়ের। একজন সেনাপতি থেকে একজন রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার বর্ণনটা পূর্ণাঙ্গ ক্যানভাসেই ফুটে উঠেছে মনে হয়েছে। জিয়ার মৃত্রুর পর সাত্তারের বিএনপি এবং তারপর হাতবদল হয়ে খালেদা জিয়ার বিএনপির হালধরার বর্ণনাটাও যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বর্ণনা করেছেন লেখক। একই ক্যানভাসে উঠে এসেছে এরশাদের সামরিক শাসন আর তৎকালীন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দলের ভূমিকা। এরপর নব্বইয়ের দশকে বিএনপির নবজাগরণ, ক্ষমতাসীন হয়ে তাদের নেতাদের কর্মকান্ড আর ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচন নিয়ে বিএনপির বিতর্কিত কার্যকলাপ নিয়ে বর্ণনাও অনেক তথ্যবহুল। তবে ছিয়ানব্বইয়ের পর থেকে বিরোধী দলে বিএনপির কর্মকান্ড, ২০০১-০৬ এর বিএনপির কর্মকান্ড কিংবা পরবর্তীতে বিএনপির কর্মকান্ড অত বড় পরিসরে আসেনি যদিও যতটুকু লেখক তুলে ধরেছেন তাতেই স্পষ্টতই বিএনপির নেতৃত্বের সংকট, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা আর একক নেতৃত্বের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কথা বেশ নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন।

এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণের প্র্যাকটিস খুব একটা নেই। সেই দিক বিবেচনায় এই বইটি বেশ ভাল একটি নমুনা হতে পারে। প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন বইয়ের আর পত্রিকার রেফারেন্স ব্যবহৃত হয়েছে এ বইয়ে, বইটি লিখতে নেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএনপির সাথে জড়িত অনেকেরই সাক্ষাৎকার। মুখের কথা শুনে শুনে মিথ বিশ্বাস না করে বরং এমন গ্রন্থ পড়ে যে কোন সাধারণ মানুষ কিংবা রাজনৈতিক কর্মীরই একটি দলের আদর্শ আর অতীত কর্মকান্ড তথা ইতিহাস জানতে সহায়ক হতে পারে। সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।

রিভিউ: ৮.৫/১০

Friday 26 February 2016

বুক রিভিউঃ যে প্রহরে নেই আমি - রাসয়াত রহমান

উপন্যাসের শুরুটা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা। গল্পটা যাকে দিয়ে শুরু হয় সে এক আমেরিকান। নাম তার এন্ডারসন, এক ভবঘুরে আমেরিকান। ভাবছেন তার সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কি সম্পর্ক? উপন্যাসটায় একটার পর একটা ঘটনা যখন মোড়ে মোড়ে বাঁক নিবে তখন ঠিক তখন গল্পের কোন এক গলির মুখে এসে এই আমেরিকানের কোন আত্মীয় এসে হাজির হবে, গল্পটা শুরুর মতো শেষটায় এসে কোন এক বিদেশীর সামান্য ছোঁয়ায় হয়তো পূর্ণতা পাবে!

রহস্য বাদ দিয়ে উপন্যাসের মূল অংশে আসা যাক। গল্প আমাদের এই প্রজন্মের। মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নই মানুষকে বড় করে তোলে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগে কোন কোন দুর্ঘটনা জীবনের স্বপ্নটাকে দূর আকাশের তারাতে রূপান্তর করে। নায়লা তেমনই এক চরিত্র। অল্প বয়সে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে এক ব্যাংকারের ঘরণী। দুই সন্তান, জেরিন আর নাফি। জেরিনের বন্ধু তারিফ। শহুরে উচ্চবিত্ত বলতে যা বোঝায় সেই বিত্তবান কোন এক পরিবারের সন্তান। গল্পের এক মোড়ে এসে তারিফের পাশে দাঁড়াবে তার চাচা-চাচী জামিল আর সামান্থা। সামান্থা আর নায়লা স্কুল জীবনের সহপাঠী। মফস্বলের স্কুলে একসাথে পড়াশোনা ছিলো। দুইজনের জীবন দুই বাঁকে বেঁকে যায়। সামান্থা আইবিএর টিচার। সামান্থার স্বামী জামিলও নায়লার পূর্বপরিচিত, একই শহরে বেড়ে ওঠা। কিন্তু এই পরিচয়ের মাঝে কিন্তু ছিলো। কিন্তুটা উপন্যাসে লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বাকী রইলো রাজু। বাগেরহাটের ছেলে। খুলনায় পড়ালেখা করেছে, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছে। পিওর টেলেন্ট যাকে বলে তেমন মেধাবী। প্রথমেই যে বলেছি উপন্যাসে ঘটনা শুধু বাঁক নেয়, আসলে বাঁক নেয় না। এই রাজু ছেলেটা বাঁক খাওয়ায়। ক্রিকেটে যেমন স্পিনার বল করার সময় বলের বাঁক নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমন এই ছেলেটা উপন্যাসের অনেকাংশ জুড়ে বাঁক খাওয়ায়। এই ছেলেকে এক একবার এক এক জায়গায় দেখা যাবে। কখনো ঢাকার কোন মেছে, আবার কখনো জামিল-সামান্থার বাসায় আশ্রিত হতে, আবার কখনো নায়লার বাসায় অতিথি হিসেবে আর কখনোবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হলে।

জীবনটা অদ্ভূত। আর অদ্ভূত জীবনটার রহস্যগুলো আবিষ্কার করে বসে জীবনটা সহজ করে রাজুর মতো মানুষেরা। স্বপ্ন হারানো মানুষের স্বপ্নকে খুঁজে দেয়া, চরম বিপর্যস্ত মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও বিপদমুক্ত করা -এসব তার মতো সাধারণ মানুষের অসাধারণ কাজ। লেখক এই কাজটা খুব সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন।

বাকী রইলো মুক্তিযোদ্ধা জলিল সাহেব। এই চরিত্রটা উপন্যাসকে সম্পূর্ণতা দিয়েছেন।

বইছিলাম লেখক রাসয়াত রহমান জিকোর নতুন উপন্যাস 'যে প্রহরে নেই আমি'। বইটা কিনে কখন যে পড়তে বসে শেষ করে ফেলেছি টের পাইনি। খুব চমৎকারভাবে একটার পর একটা ঘটনার সিকোয়েন্স বর্ণনা। লেখক যতই দাবি করুক তিনি সময় দিয়ে লিখতে পারেননি, তবে আমার পড়া তার সেরা বই এটি। তুলনা দেয়া ঠিক হবে কিনা জানিনা, তবে গল্প শেষ করে মনে হলো 'আরেহ্! এতো দেখি চেতন ভগতকেও হার মানানো গল্প লিখলো!'

এক কথায় অসাধারণ এক উপন্যাস। না পড়লে মিস করবেন টাইপের।


ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৬

Thursday 18 February 2016

দীর্ঘশ্বাস

: 'কারো সাথে সম্পর্ক আছে?'
প্রায়ই স্মিত হেসে উত্তর দেই, 'নেই'। আসলে মিথ্যে বলা হয়।

সম্পর্ক আছে। দীর্ঘশ্বাসের সম্পর্ক। হুট করে অনেক বছর পর এখানে-ওখানে কারো কারো দেখা পেলে শ্বাসটা দীর্ঘ হয়। কবি হলে বলতাম, 'এমন তো হওয়ার ছিলো না!' জীবনানন্দ হলে বলতাম, 'এতদিন কোথায় ছিলেম?'

বলা হয় না কিছুই। না তাকে, না অন্য কাউকে। না গদ্যে, না পদ্যে। কোথায় না। পারলে নির্মলেন্দুর মতো বলতাম, 'নীরা ভালোবাসেনি!'
কিংবা লতিফুর ইসলাম শিবলীর মতো কোন গ্রিক তরুণীকে বলতাম, 'তুমি কি আমার আকাশি হবে?'

বলা হয় না কাউকে কিছুই। শুধু বুকের মধ্যে পাথর চেপে রাখা, আর সুদীর্ঘ হাহাকারে বিলীন হওয়া অার্তনাদের প্রতিধ্বনি শুনি।

ভূপেনের মতো যদি বলি,
'চেনা চেনা সুরটিকে কিছুতে না চিনি।
নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি।
প্রতিধ্বনি শুনি আমি প্রতিধ্বনি শুনি।'