কিউবার মতো আমেরিকার নাকের ডগায় থাকা একটা দেশ স্পেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সাহায্য পায় আমেরিকার। তারপর? বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদী আমেরিকা দখল করে কিউবার অর্থনীতি। পুতুল সরকার বসিয়ে কিউবার সম্পদ অাহরণ বেশ ভালোভাবেই করছিলো। এক স্পেনিশ বাবা আর কিউবান মায়ের ঘরে জন্ম হয় ক্যাস্ট্রোর.. ফিদেল ক্যাস্ট্রো। শৈশবেই প্রথা অনুযায়ী পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বাবা-মায়ের থেকে দূরে পাঠানো, তারপর একসময় বোর্ডিং স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে রাজনীতিতে পা। পুঁজিবাদে বড়ই অনাস্থা। নিজের ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোকে সাথে নিয়ে গেরিলা দল বানিয়ে সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, সামরিক বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে বন্দী জীবন, মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে আসা, জীবন বাঁচাতে মেক্সিকো গমন, চে গুয়েভারার সান্নিধ্য, একসাথে কিউবায় আক্রমণ, চূড়ান্ত বিজয়, আমেরিকার সাথে স্বল্পশক্তি নিয়েও যুদ্ধে প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার স্বত্তেও মাথা উঁচু করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সোভিয়েত পতনের পরও সমাজতন্ত্র নিয়ে সফলভাবে দেশ পরিচালনা আর বিশ্বমিডিয়ায় ক্রমাগত উদ্দেশ্যমূলকভাবে খলনায়ক আর একনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের পরও কিভাবে দেশের জনগণের ভালবাসায় এখনো সিক্ত হন সে সব নিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রে গল্প করেছেন বাংলাদেশী এক তরুণের সাথে।
কাল্পনিক সাক্ষাতকার হলেও লেখক শাহাদুজ্জামান বেশ চমৎকারভাবে ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ক্যাস্ট্রোর আদর্শকে এবং জীবনীকে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। এক কথায় বইটিকে বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম সেরা ডকুফিকশনের স্বীকৃতি দিতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না!
Showing posts with label রিভিউ. Show all posts
Showing posts with label রিভিউ. Show all posts
Thursday, 5 May 2016
Wednesday, 9 March 2016
বুক রিভিউ: বিএনপি সময়-অসময়
গত চার-পাঁচদিন বেশ সময় নিয়ে পড়ে শেষ করলাম লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের লেখা সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত 'বিএনপি : সময় অসময়' গ্রন্থটি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির গত ৩৭ বছরের উঠা-নামাই শুধু নয়, বিএনপি গঠনের প্রেক্ষাপট আর মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বিএনপি প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তারিত লেখা আছে এ বইয়ে। দশটি ভাগে ভাগ করে বিএনপির সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াসটা চমৎকার ছিলো।
'বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ'কে সরিয়ে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'কে সামনে এনে একদম ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে গড়ে উঠে বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যদিও প্রথমে 'জাগদল' আর পরে 'বিএনএফ' থেকে 'বিএনপি'তে পরিণত হয় দলটি। লেখক প্রথমেই জিয়ার মেজর থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার বর্ণনাটা খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
একজন সামরিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে জিয়ার দুর্বল আর সবল দিকগুলো তুলে ধরে কিভাবে রাজনৈতিকদের মতো বক্তিতা দিয়ে মানুষ পটানোর ক্ষমতা না থাকার স্বত্তেও খালকাটাসহ মাইলের পর মাইল হেঁটে বিভিন্ন কর্মসূচী দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন তারও বিস্তারিত বর্ণনা বেশ আকর্ষণীয় দিক এই বইয়ের। একজন সেনাপতি থেকে একজন রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার বর্ণনটা পূর্ণাঙ্গ ক্যানভাসেই ফুটে উঠেছে মনে হয়েছে। জিয়ার মৃত্রুর পর সাত্তারের বিএনপি এবং তারপর হাতবদল হয়ে খালেদা জিয়ার বিএনপির হালধরার বর্ণনাটাও যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বর্ণনা করেছেন লেখক। একই ক্যানভাসে উঠে এসেছে এরশাদের সামরিক শাসন আর তৎকালীন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দলের ভূমিকা। এরপর নব্বইয়ের দশকে বিএনপির নবজাগরণ, ক্ষমতাসীন হয়ে তাদের নেতাদের কর্মকান্ড আর ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচন নিয়ে বিএনপির বিতর্কিত কার্যকলাপ নিয়ে বর্ণনাও অনেক তথ্যবহুল। তবে ছিয়ানব্বইয়ের পর থেকে বিরোধী দলে বিএনপির কর্মকান্ড, ২০০১-০৬ এর বিএনপির কর্মকান্ড কিংবা পরবর্তীতে বিএনপির কর্মকান্ড অত বড় পরিসরে আসেনি যদিও যতটুকু লেখক তুলে ধরেছেন তাতেই স্পষ্টতই বিএনপির নেতৃত্বের সংকট, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা আর একক নেতৃত্বের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কথা বেশ নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন।
এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণের প্র্যাকটিস খুব একটা নেই। সেই দিক বিবেচনায় এই বইটি বেশ ভাল একটি নমুনা হতে পারে। প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন বইয়ের আর পত্রিকার রেফারেন্স ব্যবহৃত হয়েছে এ বইয়ে, বইটি লিখতে নেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএনপির সাথে জড়িত অনেকেরই সাক্ষাৎকার। মুখের কথা শুনে শুনে মিথ বিশ্বাস না করে বরং এমন গ্রন্থ পড়ে যে কোন সাধারণ মানুষ কিংবা রাজনৈতিক কর্মীরই একটি দলের আদর্শ আর অতীত কর্মকান্ড তথা ইতিহাস জানতে সহায়ক হতে পারে। সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।
রিভিউ: ৮.৫/১০
'বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ'কে সরিয়ে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'কে সামনে এনে একদম ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে গড়ে উঠে বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যদিও প্রথমে 'জাগদল' আর পরে 'বিএনএফ' থেকে 'বিএনপি'তে পরিণত হয় দলটি। লেখক প্রথমেই জিয়ার মেজর থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার বর্ণনাটা খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
একজন সামরিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে জিয়ার দুর্বল আর সবল দিকগুলো তুলে ধরে কিভাবে রাজনৈতিকদের মতো বক্তিতা দিয়ে মানুষ পটানোর ক্ষমতা না থাকার স্বত্তেও খালকাটাসহ মাইলের পর মাইল হেঁটে বিভিন্ন কর্মসূচী দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন তারও বিস্তারিত বর্ণনা বেশ আকর্ষণীয় দিক এই বইয়ের। একজন সেনাপতি থেকে একজন রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার বর্ণনটা পূর্ণাঙ্গ ক্যানভাসেই ফুটে উঠেছে মনে হয়েছে। জিয়ার মৃত্রুর পর সাত্তারের বিএনপি এবং তারপর হাতবদল হয়ে খালেদা জিয়ার বিএনপির হালধরার বর্ণনাটাও যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বর্ণনা করেছেন লেখক। একই ক্যানভাসে উঠে এসেছে এরশাদের সামরিক শাসন আর তৎকালীন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দলের ভূমিকা। এরপর নব্বইয়ের দশকে বিএনপির নবজাগরণ, ক্ষমতাসীন হয়ে তাদের নেতাদের কর্মকান্ড আর ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচন নিয়ে বিএনপির বিতর্কিত কার্যকলাপ নিয়ে বর্ণনাও অনেক তথ্যবহুল। তবে ছিয়ানব্বইয়ের পর থেকে বিরোধী দলে বিএনপির কর্মকান্ড, ২০০১-০৬ এর বিএনপির কর্মকান্ড কিংবা পরবর্তীতে বিএনপির কর্মকান্ড অত বড় পরিসরে আসেনি যদিও যতটুকু লেখক তুলে ধরেছেন তাতেই স্পষ্টতই বিএনপির নেতৃত্বের সংকট, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা আর একক নেতৃত্বের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কথা বেশ নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন।
এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণের প্র্যাকটিস খুব একটা নেই। সেই দিক বিবেচনায় এই বইটি বেশ ভাল একটি নমুনা হতে পারে। প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন বইয়ের আর পত্রিকার রেফারেন্স ব্যবহৃত হয়েছে এ বইয়ে, বইটি লিখতে নেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএনপির সাথে জড়িত অনেকেরই সাক্ষাৎকার। মুখের কথা শুনে শুনে মিথ বিশ্বাস না করে বরং এমন গ্রন্থ পড়ে যে কোন সাধারণ মানুষ কিংবা রাজনৈতিক কর্মীরই একটি দলের আদর্শ আর অতীত কর্মকান্ড তথা ইতিহাস জানতে সহায়ক হতে পারে। সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।
রিভিউ: ৮.৫/১০
Friday, 26 February 2016
বুক রিভিউঃ যে প্রহরে নেই আমি - রাসয়াত রহমান
উপন্যাসের শুরুটা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা। গল্পটা যাকে দিয়ে শুরু হয় সে এক আমেরিকান। নাম তার এন্ডারসন, এক ভবঘুরে আমেরিকান। ভাবছেন তার সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কি সম্পর্ক? উপন্যাসটায় একটার পর একটা ঘটনা যখন মোড়ে মোড়ে বাঁক নিবে তখন ঠিক তখন গল্পের কোন এক গলির মুখে এসে এই আমেরিকানের কোন আত্মীয় এসে হাজির হবে, গল্পটা শুরুর মতো শেষটায় এসে কোন এক বিদেশীর সামান্য ছোঁয়ায় হয়তো পূর্ণতা পাবে!
রহস্য বাদ দিয়ে উপন্যাসের মূল অংশে আসা যাক। গল্প আমাদের এই প্রজন্মের। মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নই মানুষকে বড় করে তোলে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগে কোন কোন দুর্ঘটনা জীবনের স্বপ্নটাকে দূর আকাশের তারাতে রূপান্তর করে। নায়লা তেমনই এক চরিত্র। অল্প বয়সে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে এক ব্যাংকারের ঘরণী। দুই সন্তান, জেরিন আর নাফি। জেরিনের বন্ধু তারিফ। শহুরে উচ্চবিত্ত বলতে যা বোঝায় সেই বিত্তবান কোন এক পরিবারের সন্তান। গল্পের এক মোড়ে এসে তারিফের পাশে দাঁড়াবে তার চাচা-চাচী জামিল আর সামান্থা। সামান্থা আর নায়লা স্কুল জীবনের সহপাঠী। মফস্বলের স্কুলে একসাথে পড়াশোনা ছিলো। দুইজনের জীবন দুই বাঁকে বেঁকে যায়। সামান্থা আইবিএর টিচার। সামান্থার স্বামী জামিলও নায়লার পূর্বপরিচিত, একই শহরে বেড়ে ওঠা। কিন্তু এই পরিচয়ের মাঝে কিন্তু ছিলো। কিন্তুটা উপন্যাসে লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বাকী রইলো রাজু। বাগেরহাটের ছেলে। খুলনায় পড়ালেখা করেছে, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছে। পিওর টেলেন্ট যাকে বলে তেমন মেধাবী। প্রথমেই যে বলেছি উপন্যাসে ঘটনা শুধু বাঁক নেয়, আসলে বাঁক নেয় না। এই রাজু ছেলেটা বাঁক খাওয়ায়। ক্রিকেটে যেমন স্পিনার বল করার সময় বলের বাঁক নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমন এই ছেলেটা উপন্যাসের অনেকাংশ জুড়ে বাঁক খাওয়ায়। এই ছেলেকে এক একবার এক এক জায়গায় দেখা যাবে। কখনো ঢাকার কোন মেছে, আবার কখনো জামিল-সামান্থার বাসায় আশ্রিত হতে, আবার কখনো নায়লার বাসায় অতিথি হিসেবে আর কখনোবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হলে।
জীবনটা অদ্ভূত। আর অদ্ভূত জীবনটার রহস্যগুলো আবিষ্কার করে বসে জীবনটা সহজ করে রাজুর মতো মানুষেরা। স্বপ্ন হারানো মানুষের স্বপ্নকে খুঁজে দেয়া, চরম বিপর্যস্ত মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও বিপদমুক্ত করা -এসব তার মতো সাধারণ মানুষের অসাধারণ কাজ। লেখক এই কাজটা খুব সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন।
বাকী রইলো মুক্তিযোদ্ধা জলিল সাহেব। এই চরিত্রটা উপন্যাসকে সম্পূর্ণতা দিয়েছেন।
বইছিলাম লেখক রাসয়াত রহমান জিকোর নতুন উপন্যাস 'যে প্রহরে নেই আমি'। বইটা কিনে কখন যে পড়তে বসে শেষ করে ফেলেছি টের পাইনি। খুব চমৎকারভাবে একটার পর একটা ঘটনার সিকোয়েন্স বর্ণনা। লেখক যতই দাবি করুক তিনি সময় দিয়ে লিখতে পারেননি, তবে আমার পড়া তার সেরা বই এটি। তুলনা দেয়া ঠিক হবে কিনা জানিনা, তবে গল্প শেষ করে মনে হলো 'আরেহ্! এতো দেখি চেতন ভগতকেও হার মানানো গল্প লিখলো!'
এক কথায় অসাধারণ এক উপন্যাস। না পড়লে মিস করবেন টাইপের।
ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৬
রহস্য বাদ দিয়ে উপন্যাসের মূল অংশে আসা যাক। গল্প আমাদের এই প্রজন্মের। মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নই মানুষকে বড় করে তোলে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগে কোন কোন দুর্ঘটনা জীবনের স্বপ্নটাকে দূর আকাশের তারাতে রূপান্তর করে। নায়লা তেমনই এক চরিত্র। অল্প বয়সে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে এক ব্যাংকারের ঘরণী। দুই সন্তান, জেরিন আর নাফি। জেরিনের বন্ধু তারিফ। শহুরে উচ্চবিত্ত বলতে যা বোঝায় সেই বিত্তবান কোন এক পরিবারের সন্তান। গল্পের এক মোড়ে এসে তারিফের পাশে দাঁড়াবে তার চাচা-চাচী জামিল আর সামান্থা। সামান্থা আর নায়লা স্কুল জীবনের সহপাঠী। মফস্বলের স্কুলে একসাথে পড়াশোনা ছিলো। দুইজনের জীবন দুই বাঁকে বেঁকে যায়। সামান্থা আইবিএর টিচার। সামান্থার স্বামী জামিলও নায়লার পূর্বপরিচিত, একই শহরে বেড়ে ওঠা। কিন্তু এই পরিচয়ের মাঝে কিন্তু ছিলো। কিন্তুটা উপন্যাসে লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বাকী রইলো রাজু। বাগেরহাটের ছেলে। খুলনায় পড়ালেখা করেছে, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছে। পিওর টেলেন্ট যাকে বলে তেমন মেধাবী। প্রথমেই যে বলেছি উপন্যাসে ঘটনা শুধু বাঁক নেয়, আসলে বাঁক নেয় না। এই রাজু ছেলেটা বাঁক খাওয়ায়। ক্রিকেটে যেমন স্পিনার বল করার সময় বলের বাঁক নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমন এই ছেলেটা উপন্যাসের অনেকাংশ জুড়ে বাঁক খাওয়ায়। এই ছেলেকে এক একবার এক এক জায়গায় দেখা যাবে। কখনো ঢাকার কোন মেছে, আবার কখনো জামিল-সামান্থার বাসায় আশ্রিত হতে, আবার কখনো নায়লার বাসায় অতিথি হিসেবে আর কখনোবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হলে।
জীবনটা অদ্ভূত। আর অদ্ভূত জীবনটার রহস্যগুলো আবিষ্কার করে বসে জীবনটা সহজ করে রাজুর মতো মানুষেরা। স্বপ্ন হারানো মানুষের স্বপ্নকে খুঁজে দেয়া, চরম বিপর্যস্ত মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও বিপদমুক্ত করা -এসব তার মতো সাধারণ মানুষের অসাধারণ কাজ। লেখক এই কাজটা খুব সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন।
বাকী রইলো মুক্তিযোদ্ধা জলিল সাহেব। এই চরিত্রটা উপন্যাসকে সম্পূর্ণতা দিয়েছেন।
বইছিলাম লেখক রাসয়াত রহমান জিকোর নতুন উপন্যাস 'যে প্রহরে নেই আমি'। বইটা কিনে কখন যে পড়তে বসে শেষ করে ফেলেছি টের পাইনি। খুব চমৎকারভাবে একটার পর একটা ঘটনার সিকোয়েন্স বর্ণনা। লেখক যতই দাবি করুক তিনি সময় দিয়ে লিখতে পারেননি, তবে আমার পড়া তার সেরা বই এটি। তুলনা দেয়া ঠিক হবে কিনা জানিনা, তবে গল্প শেষ করে মনে হলো 'আরেহ্! এতো দেখি চেতন ভগতকেও হার মানানো গল্প লিখলো!'
এক কথায় অসাধারণ এক উপন্যাস। না পড়লে মিস করবেন টাইপের।
ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৬
Sunday, 1 February 2015
জানুয়ারী '১৫-তে পড়া বইগুলো
বছরের অন্য সময়ের তুলনায় জানুয়ারীতে সবসময়ই অবসরটা বেশী থাকে। এ অবসরে কিছু চমৎকার বই পড়েছি। নিচে সেগুলো নিয়েই লিখছি।
Shyam Mehra ও কল সেন্টারে তার ৫ কলিগকে নিয়ে ঘটে যাওয়া একটি রাতের ঘটনা নিয়ে লেখা উপন্যাস। যেখানে তাদের ফোন করে স্বয়ং ঈশ্বর! বরাবরের মতোই চেতন ভাগাত তার লেখা উত্তম পুরুষ বা ফার্স্ট পার্সনে লিখেছেন আর সব গল্পের মতই এ গল্পও যুবসমাজকে প্রাধান্য দিয়ে (এ পর্যন্ত প্রত্যেক গল্পই young age-এর ছেলে-মেয়েদের নিয়েই লিখেছেন!)।
রাতের শিফটে কল সেন্টারে কাজ শুরুর আগ থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক ঘন্টার বর্ণনা আর পাশাপাশি Shayam এর সাথে তার এক্স-গার্লফ্রেন্ড ও বর্তমান কলিগ Priyanka-র স্মৃতিচারণ খুব সুন্দরভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। আমার ধারণা দুটো কারণে চেতন ভাগাতের লেখা পাঠক এতো পছন্দ করে। এক, অতীতের ঘটনাগুলো সুনিপুণভাবে লেখনীতে তুলে ধরা আর দুই, চমৎকার সেন্স অব হিউমর।

রাইফেল, রোটি, আওরাত - আনোয়ার পাশা
অনেকদিন ধরে পড়বো পড়বো করে পড়া হয়নি বইটি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোর একটা চিত্র এ বইয়ে লেখক তুলে ধরেছেন। লেখক আনোয়ার পাশাকে নিয়ে আলাদা করে বলতে হয় যিনি ছিলেন মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং পাশাপাশি একজন লেখক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন এবং রণাঙ্গণ থেকে এই বিখ্যাত উপন্যাসটি লিখেন। লেখক আনোয়ার পাশা আল বদরদের হাতে ১৪ ডিসেম্বর অপহৃত হয়ে পরে নিহত হন। তবে থেকে গেছে তার কালজয়ী উপন্যাসটি। খুব সম্ভবত একাত্তরের রণাঙ্গণ থেকে লেখা একমাত্র উপন্যাস এটি।
এ উপন্যাসের নায়কও লেখকের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তবে ইংরেজী বিভাগের। নাম তার সুদীপ্ত শাহিন। অফিসিয়াল নাম নয়, পাকিস্থান আমলে এ নাম হিন্দুয়ানি বলে বিবেচিত হতো বলে এফিডেটিভ করে অন্য নামে শিক্ষকতা করতো। উপন্যাসের শুরুতেই ২৫শে মার্চের কালরাতে গণহত্যার পরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকাগুলোতে বসবাসকারীদের করুণ পরিণতি বর্ণনায় আসে। সত্যি বলতে কি, শিক্ষকদের বাসায়-সিড়িতে লাশ আর রক্তের বর্ণনা, পাক হানাদাররা ছাত্রদের গুলি করে মেরে ফেলে যাওয়ার পরের বর্ণনাগুলো এত বছর পরে পড়েও আমার গায়ের রোম শিউরে উঠেছে। জামাত আর নেজামে ইসলামীর কর্মীদের দালালীর চিত্র আর বিহারীদের মারমুখী আচরণও গল্পের মধ্যে তুলে ধরেছেন লেখক। যুদ্ধের শুরুতে কোণাঠাসা দুটো পরিবার আশ্রয়ের খোঁজে ঢাকা শহরে এদিক-সেদিক করে বিভিন্ন মানুষের বাসা বাড়ীতে ঘুরে বেড়ানোর ঘটনা হৃদয়ে দাগ কাটার মতো করেই বর্ণনা করেছেন লেখক। আগ্রহী পাঠকরা এই বইয়ে চড়ে একাত্তরের টাইম লাইনে ঘুরে আসতে পারেন।

The 3 mistakes of my life by Chetan Bhagat
ব্যবসা, ক্রিকেট আর ধর্ম - এ তিনটি জিনিসকে নিয়ে বেড়ে ওঠা তিন যুবক বন্ধুর গল্প The 3 mistakes of my life. বরাবরের মতই চেতন ভাগাত একজনকে বেছে নিয়েছেন ঘটনার বর্ণনা করতে। লেখক IIM আহমেদাবাদে পড়ার সুবাদে গুজরাটে থেকেছেন, তাই গুজরাটিদের রক্তে মিশে থাকা ব্যবসা আর কিছু হিন্দু মৌলবাদী ধর্মের প্রতি অন্ধত্বটাকেও তুলে ধরেছেন। গল্পের এক পর্যায়ে ২০০১ সালে গুজরাটে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার চিত্রটাও তুলে ধরেছেন বেশ নিপুণভাবে যেখানে গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মৃত্যু হয়।
গোবিন্দ এবং তার দুই বন্ধু ইশান্ত ও অমি। গোবিন্দ অংকে খুবই ভালো, পাবলিক পরীক্ষায় গণিতে রেকর্ড পরিমাণ মার্কস্ তুলে এলাকায় বিখ্যাত হয়েছে। পিতা পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মায়ের সাথে সংসার সামলাচ্ছে টিউশন করে। তার মা পিঠা বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ডেলিভারী দিয়ে দু'জনের পরিবারের আয় রোজগার করছে। ইশান্ত মোটামুটি অবস্থা সম্পন্ন, তবে পিতার ইচ্ছেমত মিলেটারীতে চাকরী করা হয়নি তার। কিশোর বয়সে জেলা টীমে ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়ে বেশ নামডাক হয়েছে। আর অমি মন্দিরের সেবকের ছেলে। সে গাধা টাইপের এবং ধর্মের প্রতি ব্যাপক দুর্বলতা রয়েছে তার। তিনবন্ধু মিলে ক্রিকেট সরঞ্জামের ব্যবসা শুরু করে আর সে অনুযায়ী গল্প এগুতে থাকে। গল্পের শুরুটা হয় গোবিন্দর ইমেইল দিয়ে। আত্মহত্যার পূ্র্বে সে লেখক চেতন ভাগাতকে ইমেইল করে, আর সে ইমেইলের সূত্র ধরেই সব কিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে। চেতনের অন্যতম সেরা উপন্যাস এটি। হতাশাবাদীরা অনুপ্রেরনা খুঁজে পেতে এ বইটা অবশ্যই পড়তে পারেন। :)

সাকিব আল হাসানঃ আপন চোখে ভিন্ন চোখে - দেবব্রত মুখপাধ্যায়
লেখক বা গদ্যকার দেবব্রত মুখপাধ্যায়ের লেখার জাদু নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। পেশাগত জীবনে সাংবাদিক (মূলত ক্রীড়া সাংবাদিক) দেবব্রত দা ফেসবুক কমিউনিটি ও ব্লগ জগতে বেশ বিখ্যাত একটি নাম। আমাদের দেশের সেরা খেলোয়াড়টিকে নিয়ে এই প্রথম কোন বই লেখা হলো, আর সেটা করলেন সাংবাদিক দেবব্রত দা। এখানে লেখক না বলে সাংবাদিক বলছি এ কারণেই যে, বইটিতে মূলত সাকিব সম্পর্কে লিখেছেন বা ইন্টারভিউ দিয়েছেন দেশের ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গণের বিখ্যাত খেলোয়াড়, কোচ আর সাংবাদিকরা। এত মানুষের ইন্টারভিউ জোগাড় করে এক করতে দেবব্রত দাকে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে তা অবশ্য আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সাকিব শুধু বাংলাদেশের না, বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু এই সাকিব একসময় তো আজকের এই সাকিব ছিলেন না, ছিলেন ফয়সাল। কিন্তু ওই ফয়সাল কিভাবে আজকের এই সাকিব হয়ে উঠলেন তা জানতে অবশ্যই বইটা পড়া উচিত। সাকিবের মা, বাবা, বোন, ছোটবেলার বন্ধু, স্ত্রী আর কোচ থেকে শুরু করে বর্তমানের সহখেলোয়াড় - সবাই সাকিব সম্পর্কে বলেছেন। সত্যি বলতে সাকিব সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য জানতে পেরেছি বইটা পড়ে। তারকা সাকিবের পেছনে একজন পরিশ্রমী, অধ্যবসায়ী ক্রিকেট শ্রমিককেও স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছি। একটা মানুষ এত তারকাখ্যাতি পাবার পরও কিভাবে তার মূল ফোকাসটা সেই ছোটবেলা থেকে আজ অবদি ধরে রেখেছে তা-ও জেনেছি এ বই পড়ে।
যারা এদেশে থেকে সাধারণের কাতার থেকে অসাধারণের কাতারে যেতে চায় তাদের জন্য বোধকরি 'মাস্ট রিড' বই এটি।
2 States by Chetan Bhagat
অনেকগুলো রাজ্য নিয়ে ভারত রাষ্ট্র গঠিত হলেও রাজ্যগুলোর মানুষরা মানসিক আর সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে আজও তারা একটি একক জনগোষ্ঠী হয়ে উঠতে পারেনি। সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে হিমশিম খাওয়া লেখক চেতন ভাগাত একেবারে নিজের জীবনের কাহিনী নিয়ে কলম ধরেছেন পাঞ্জাবী আর তামিল জনগোষ্ঠী তথা নর্থ আর সাউথ ইন্ডিয়ান সমাজের অসামাঞ্জস্ব্যতাগুলো গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে।
IIM-A তে পড়তে গিয়ে পাঞ্জাবী বংশদ্ভূত দিল্লীর অধিবাসী কৃশের সাথে পরিচয় তামিল নাড়ুর অনন্যার সাথে। সেখানেই প্রেম, দুই বছর একসাথে পড়াশোনা তারপর দুজনের দু্টো ব্যাংকে চাকরী। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও পারিবারিক অপছন্দের কারণে কেউই কাউকে বিয়ে করতে পারছিলেন না আর দুজনই পরিবারের অসম্মতিতে পালিয়ে বিয়ে করার বিরোধী। যাই হোক, সাংস্কৃতিক দ্বন্দের ইতি টেনে তারা কিভাবে কাছে এসেছিলেন আর কতো ঝড় এর মাঝে বয়ে গেছে তা জানতে অবশ্যই বইটা পড়তে পারেন। একই রাষ্ট্রে থেকেও কখন দুটো পরিবারের কাছে রাষ্ট্রের চেয়ে নিজ রাজ্য কেনো বড় হয়ে গিয়েছিলো তা বুঝতে এ উপন্যাস একটা ভালো অপশন। আট-দশটা লুতুপুতু প্রেমের কাহিনী নয়, বলা যায় সলিড প্রেমের কাহিনী এই 2 States। তবে এর ফাঁকে বলে রাখি, এই উপন্যাসকে কেন্দ্র করে তৈরী করা বলিউডের মুভী 2 States দেখে আমি যারপরনাই হতাশ হয়েছি। মুভী দেখে কেউ এই উপন্যাসকে বিচার করতে গেলে লেখকের প্রতি চরম অবিচার হয়ে যাবে।
এগুলো ছাড়াও জানুয়ারীতে আরো কিছু বই পড়তে ধরে আর শেষ করে ওঠা হয়নি। এর মাঝে চেতন ভাগাতের কলাম সমগ্র What Young India Wants আর পাওলো কোয়েলহো'র The Alchemist অসমাপ্ত পড়া অবস্থায় রয়েছে। ধন্যবাদ। :)
Shyam Mehra ও কল সেন্টারে তার ৫ কলিগকে নিয়ে ঘটে যাওয়া একটি রাতের ঘটনা নিয়ে লেখা উপন্যাস। যেখানে তাদের ফোন করে স্বয়ং ঈশ্বর! বরাবরের মতোই চেতন ভাগাত তার লেখা উত্তম পুরুষ বা ফার্স্ট পার্সনে লিখেছেন আর সব গল্পের মতই এ গল্পও যুবসমাজকে প্রাধান্য দিয়ে (এ পর্যন্ত প্রত্যেক গল্পই young age-এর ছেলে-মেয়েদের নিয়েই লিখেছেন!)।
রাতের শিফটে কল সেন্টারে কাজ শুরুর আগ থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক ঘন্টার বর্ণনা আর পাশাপাশি Shayam এর সাথে তার এক্স-গার্লফ্রেন্ড ও বর্তমান কলিগ Priyanka-র স্মৃতিচারণ খুব সুন্দরভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। আমার ধারণা দুটো কারণে চেতন ভাগাতের লেখা পাঠক এতো পছন্দ করে। এক, অতীতের ঘটনাগুলো সুনিপুণভাবে লেখনীতে তুলে ধরা আর দুই, চমৎকার সেন্স অব হিউমর।

রাইফেল, রোটি, আওরাত - আনোয়ার পাশা
অনেকদিন ধরে পড়বো পড়বো করে পড়া হয়নি বইটি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোর একটা চিত্র এ বইয়ে লেখক তুলে ধরেছেন। লেখক আনোয়ার পাশাকে নিয়ে আলাদা করে বলতে হয় যিনি ছিলেন মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং পাশাপাশি একজন লেখক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন এবং রণাঙ্গণ থেকে এই বিখ্যাত উপন্যাসটি লিখেন। লেখক আনোয়ার পাশা আল বদরদের হাতে ১৪ ডিসেম্বর অপহৃত হয়ে পরে নিহত হন। তবে থেকে গেছে তার কালজয়ী উপন্যাসটি। খুব সম্ভবত একাত্তরের রণাঙ্গণ থেকে লেখা একমাত্র উপন্যাস এটি।
এ উপন্যাসের নায়কও লেখকের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তবে ইংরেজী বিভাগের। নাম তার সুদীপ্ত শাহিন। অফিসিয়াল নাম নয়, পাকিস্থান আমলে এ নাম হিন্দুয়ানি বলে বিবেচিত হতো বলে এফিডেটিভ করে অন্য নামে শিক্ষকতা করতো। উপন্যাসের শুরুতেই ২৫শে মার্চের কালরাতে গণহত্যার পরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকাগুলোতে বসবাসকারীদের করুণ পরিণতি বর্ণনায় আসে। সত্যি বলতে কি, শিক্ষকদের বাসায়-সিড়িতে লাশ আর রক্তের বর্ণনা, পাক হানাদাররা ছাত্রদের গুলি করে মেরে ফেলে যাওয়ার পরের বর্ণনাগুলো এত বছর পরে পড়েও আমার গায়ের রোম শিউরে উঠেছে। জামাত আর নেজামে ইসলামীর কর্মীদের দালালীর চিত্র আর বিহারীদের মারমুখী আচরণও গল্পের মধ্যে তুলে ধরেছেন লেখক। যুদ্ধের শুরুতে কোণাঠাসা দুটো পরিবার আশ্রয়ের খোঁজে ঢাকা শহরে এদিক-সেদিক করে বিভিন্ন মানুষের বাসা বাড়ীতে ঘুরে বেড়ানোর ঘটনা হৃদয়ে দাগ কাটার মতো করেই বর্ণনা করেছেন লেখক। আগ্রহী পাঠকরা এই বইয়ে চড়ে একাত্তরের টাইম লাইনে ঘুরে আসতে পারেন।

The 3 mistakes of my life by Chetan Bhagat
ব্যবসা, ক্রিকেট আর ধর্ম - এ তিনটি জিনিসকে নিয়ে বেড়ে ওঠা তিন যুবক বন্ধুর গল্প The 3 mistakes of my life. বরাবরের মতই চেতন ভাগাত একজনকে বেছে নিয়েছেন ঘটনার বর্ণনা করতে। লেখক IIM আহমেদাবাদে পড়ার সুবাদে গুজরাটে থেকেছেন, তাই গুজরাটিদের রক্তে মিশে থাকা ব্যবসা আর কিছু হিন্দু মৌলবাদী ধর্মের প্রতি অন্ধত্বটাকেও তুলে ধরেছেন। গল্পের এক পর্যায়ে ২০০১ সালে গুজরাটে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার চিত্রটাও তুলে ধরেছেন বেশ নিপুণভাবে যেখানে গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মৃত্যু হয়।
গোবিন্দ এবং তার দুই বন্ধু ইশান্ত ও অমি। গোবিন্দ অংকে খুবই ভালো, পাবলিক পরীক্ষায় গণিতে রেকর্ড পরিমাণ মার্কস্ তুলে এলাকায় বিখ্যাত হয়েছে। পিতা পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মায়ের সাথে সংসার সামলাচ্ছে টিউশন করে। তার মা পিঠা বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ডেলিভারী দিয়ে দু'জনের পরিবারের আয় রোজগার করছে। ইশান্ত মোটামুটি অবস্থা সম্পন্ন, তবে পিতার ইচ্ছেমত মিলেটারীতে চাকরী করা হয়নি তার। কিশোর বয়সে জেলা টীমে ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়ে বেশ নামডাক হয়েছে। আর অমি মন্দিরের সেবকের ছেলে। সে গাধা টাইপের এবং ধর্মের প্রতি ব্যাপক দুর্বলতা রয়েছে তার। তিনবন্ধু মিলে ক্রিকেট সরঞ্জামের ব্যবসা শুরু করে আর সে অনুযায়ী গল্প এগুতে থাকে। গল্পের শুরুটা হয় গোবিন্দর ইমেইল দিয়ে। আত্মহত্যার পূ্র্বে সে লেখক চেতন ভাগাতকে ইমেইল করে, আর সে ইমেইলের সূত্র ধরেই সব কিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে। চেতনের অন্যতম সেরা উপন্যাস এটি। হতাশাবাদীরা অনুপ্রেরনা খুঁজে পেতে এ বইটা অবশ্যই পড়তে পারেন। :)

সাকিব আল হাসানঃ আপন চোখে ভিন্ন চোখে - দেবব্রত মুখপাধ্যায়
লেখক বা গদ্যকার দেবব্রত মুখপাধ্যায়ের লেখার জাদু নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। পেশাগত জীবনে সাংবাদিক (মূলত ক্রীড়া সাংবাদিক) দেবব্রত দা ফেসবুক কমিউনিটি ও ব্লগ জগতে বেশ বিখ্যাত একটি নাম। আমাদের দেশের সেরা খেলোয়াড়টিকে নিয়ে এই প্রথম কোন বই লেখা হলো, আর সেটা করলেন সাংবাদিক দেবব্রত দা। এখানে লেখক না বলে সাংবাদিক বলছি এ কারণেই যে, বইটিতে মূলত সাকিব সম্পর্কে লিখেছেন বা ইন্টারভিউ দিয়েছেন দেশের ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গণের বিখ্যাত খেলোয়াড়, কোচ আর সাংবাদিকরা। এত মানুষের ইন্টারভিউ জোগাড় করে এক করতে দেবব্রত দাকে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে তা অবশ্য আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সাকিব শুধু বাংলাদেশের না, বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু এই সাকিব একসময় তো আজকের এই সাকিব ছিলেন না, ছিলেন ফয়সাল। কিন্তু ওই ফয়সাল কিভাবে আজকের এই সাকিব হয়ে উঠলেন তা জানতে অবশ্যই বইটা পড়া উচিত। সাকিবের মা, বাবা, বোন, ছোটবেলার বন্ধু, স্ত্রী আর কোচ থেকে শুরু করে বর্তমানের সহখেলোয়াড় - সবাই সাকিব সম্পর্কে বলেছেন। সত্যি বলতে সাকিব সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য জানতে পেরেছি বইটা পড়ে। তারকা সাকিবের পেছনে একজন পরিশ্রমী, অধ্যবসায়ী ক্রিকেট শ্রমিককেও স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছি। একটা মানুষ এত তারকাখ্যাতি পাবার পরও কিভাবে তার মূল ফোকাসটা সেই ছোটবেলা থেকে আজ অবদি ধরে রেখেছে তা-ও জেনেছি এ বই পড়ে।
যারা এদেশে থেকে সাধারণের কাতার থেকে অসাধারণের কাতারে যেতে চায় তাদের জন্য বোধকরি 'মাস্ট রিড' বই এটি।
2 States by Chetan Bhagat
অনেকগুলো রাজ্য নিয়ে ভারত রাষ্ট্র গঠিত হলেও রাজ্যগুলোর মানুষরা মানসিক আর সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে আজও তারা একটি একক জনগোষ্ঠী হয়ে উঠতে পারেনি। সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে হিমশিম খাওয়া লেখক চেতন ভাগাত একেবারে নিজের জীবনের কাহিনী নিয়ে কলম ধরেছেন পাঞ্জাবী আর তামিল জনগোষ্ঠী তথা নর্থ আর সাউথ ইন্ডিয়ান সমাজের অসামাঞ্জস্ব্যতাগুলো গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে।
IIM-A তে পড়তে গিয়ে পাঞ্জাবী বংশদ্ভূত দিল্লীর অধিবাসী কৃশের সাথে পরিচয় তামিল নাড়ুর অনন্যার সাথে। সেখানেই প্রেম, দুই বছর একসাথে পড়াশোনা তারপর দুজনের দু্টো ব্যাংকে চাকরী। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও পারিবারিক অপছন্দের কারণে কেউই কাউকে বিয়ে করতে পারছিলেন না আর দুজনই পরিবারের অসম্মতিতে পালিয়ে বিয়ে করার বিরোধী। যাই হোক, সাংস্কৃতিক দ্বন্দের ইতি টেনে তারা কিভাবে কাছে এসেছিলেন আর কতো ঝড় এর মাঝে বয়ে গেছে তা জানতে অবশ্যই বইটা পড়তে পারেন। একই রাষ্ট্রে থেকেও কখন দুটো পরিবারের কাছে রাষ্ট্রের চেয়ে নিজ রাজ্য কেনো বড় হয়ে গিয়েছিলো তা বুঝতে এ উপন্যাস একটা ভালো অপশন। আট-দশটা লুতুপুতু প্রেমের কাহিনী নয়, বলা যায় সলিড প্রেমের কাহিনী এই 2 States। তবে এর ফাঁকে বলে রাখি, এই উপন্যাসকে কেন্দ্র করে তৈরী করা বলিউডের মুভী 2 States দেখে আমি যারপরনাই হতাশ হয়েছি। মুভী দেখে কেউ এই উপন্যাসকে বিচার করতে গেলে লেখকের প্রতি চরম অবিচার হয়ে যাবে।
এগুলো ছাড়াও জানুয়ারীতে আরো কিছু বই পড়তে ধরে আর শেষ করে ওঠা হয়নি। এর মাঝে চেতন ভাগাতের কলাম সমগ্র What Young India Wants আর পাওলো কোয়েলহো'র The Alchemist অসমাপ্ত পড়া অবস্থায় রয়েছে। ধন্যবাদ। :)
Monday, 12 January 2015
২০১৪ সালে পড়া বইগুলো
২০১৪-তে পড়া বইগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখলাম। আরো পড়েছি সবগুলোর আগে থেকে লিপিবদ্ধ না করায় ভুলে গেছি, যা মনে আছে এখানে দিলামঃ
| নং | বইয়ের নাম | লেখক | সময় |
|---|---|---|---|
| ১ | কবি | হুমায়ূন আহমেদ | জানুয়ারী |
| ২ | অপেক্ষা | হুমায়ূন আহমেদ | জানুয়ারী |
| ৩ | বাদশাহ্ নামদার | হুমায়ূন আহমেদ | এপ্রিল |
| ৪ | দেয়াল | হুমায়ূন আহমেদ | জুলাই |
| ৫ | শাহবাগ থেকে হেফাজত : রাজসাক্ষীর জবানবন্দি | জিয়া হাসান | জুন |
| ৬ | অপ্সরা | আসিফ মেহদী | ফেব্রুয়ারী |
| ৭ | আমারও একটা প্রেম কাহিনী আছে | আনিসুল হক | ফেব্রুয়ারী |
| ৮ | একাত্তর ও আমার বাবা | হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবাল | ফেব্রুয়ারী |
| ৯ | শচীন রূপকথা | উৎপল শুভ্র | ফেব্রুয়ারী |
| ১০ | ইস্টিশন | মুহম্মদ জাফর ইকবাল | মে |
| ১১ | একাত্তরের দিনগুলি | জাহানারা ইমাম | আগষ্ট-সেপ্টেম্বর |
| ১২ | কলম | রাসায়ত রহমান | সেপ্টেম্বর |
| ১৩ | আনবাড়ি | লুনা রুশদী ও সাগুফতা শারমিন তানিয়া | জুন-জুলাই |
| ১৪ | Half Girlfriend | Chetan Bhagat | November-December |
| ১৫ | Five Point Someone | Chetan Bhagat | December |
| ১৬ | সাদাসিঁধে কথা | মুহম্মদ জাফর ইকবাল | অক্টোবর |
Subscribe to:
Posts (Atom)




