Thursday, 5 May 2016

রিভিউঃ আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে

কিউবার মতো আমেরিকার নাকের ডগায় থাকা একটা দেশ স্পেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সাহায্য পায় আমেরিকার। তারপর? বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদী আমেরিকা দখল করে কিউবার অর্থনীতি। পুতুল সরকার বসিয়ে কিউবার সম্পদ অাহরণ বেশ ভালোভাবেই করছিলো। এক স্পেনিশ বাবা আর কিউবান মায়ের ঘরে জন্ম হয় ক্যাস্ট্রোর.. ফিদেল ক্যাস্ট্রো। শৈশবেই প্রথা অনুযায়ী পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বাবা-মায়ের থেকে দূরে পাঠানো, তারপর একসময় বোর্ডিং স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে রাজনীতিতে পা। পুঁজিবাদে বড়ই অনাস্থা। নিজের ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোকে সাথে নিয়ে গেরিলা দল বানিয়ে সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, সামরিক বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে বন্দী জীবন, মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে আসা, জীবন বাঁচাতে মেক্সিকো গমন, চে গুয়েভারার সান্নিধ্য, একসাথে কিউবায় আক্রমণ, চূড়ান্ত বিজয়, আমেরিকার সাথে স্বল্পশক্তি নিয়েও যুদ্ধে প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার স্বত্তেও মাথা উঁচু করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সোভিয়েত পতনের পরও সমাজতন্ত্র নিয়ে সফলভাবে দেশ পরিচালনা আর বিশ্বমিডিয়ায় ক্রমাগত উদ্দেশ্যমূলকভাবে খলনায়ক আর একনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের পরও কিভাবে দেশের জনগণের ভালবাসায় এখনো সিক্ত হন সে সব নিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রে গল্প করেছেন বাংলাদেশী এক তরুণের সাথে।


কাল্পনিক সাক্ষাতকার হলেও লেখক শাহাদুজ্জামান বেশ চমৎকারভাবে ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ক্যাস্ট্রোর আদর্শকে এবং জীবনীকে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। এক কথায় বইটিকে বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম সেরা ডকুফিকশনের স্বীকৃতি দিতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না!

A life lesson

প্রথমে তিনজন মানুষ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেই। NSU লাইফে ৯০% কোর্সেই আমার অ্যাসাইনম্যান্ট বা প্রজেক্টের গ্রুপে নাজিয়া গ্রুপ পার্টনার ছিলো। প্রায় প্রতি সেমিস্টারে বেশির ভাগ কোর্সই মিলিয়ে নেই যাতে অ্যাসাইমেন্ট বা প্রজেক্টের লেখার কাজগুলো ভাগ করে নেয়া যায়। ল্যাব রিপোর্ট লেখার কাজ সবসময়ই আমি এড়িয়ে যেতাম বিরক্তিকর মনে হতো দেখে আর আমার এই কাজটা নাজিয়া করে দিতো।

হাসিবুলের সাথে পরিচয়ের পর হাসিবুলও প্রায় সব কোর্সেই প্রজেক্ট বা গ্রুপ পার্টনার ছিলো। কাজের ব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য পরায়ন এবং সময়ের কাজ সময়ে করে আর আলসেমি করে না। গ্রুপের কেউ কোন কাজ না করলে তা করিয়ে নেয়ার ক্ষমতাও চমৎকার।

সাবেক ঘুমকুমার নাঈম রিদওয়ান আবীর হলো একজন অমায়িক মানুষ। যদিও আমার প্রতিবেশী তাও সে মাঝে মাঝে নিখোঁজ হয়ে যায়, কিন্তু কাজের অ্যাকুরেসি অনেক ভালো। মানুষকে যে কোন ব্যাপারে সারল্যের সাথে নিঃশর্ত সাহায্য করতে করতে তাকে আমার বন্ধুমহলের সবচে 'ইউজড্ পারসন' হতে দেখেছি। আবীর আর নাজিয়া হলো আমার প্রথম সেমিস্টার থেকেই সবচে কাছের ফ্রেন্ড, যাদের সাথে সবসময় এটা-ওটা নিয়ে গ্যাঞ্জাম লেগেই থাকে।

যাই হোক, মূল ঘটনায় আসি। ফাজি লজিকে যখন প্রথম ছয়জনের গ্রুপ ফর্ম হচ্ছিলো তখন আমি, হাসিব আর নাজিয়া একসাথে গ্রুপে থাকার কথা হয়। বাকী তিনজন আগেও পেপার পাবলিস করেছে, তাই তাদের সাথে নিতে চাওয়ায় আমরাও রাজী হয়ে যাই। কোর্সের শুরুতেই এভাবেই কথা ফাইনাল হয়। কোর্স রি-অ্যাডভাইজের পর আরো কয়েকজন কোর্সে অ্যাড হয়, যার মধ্যে আবীরও ছিলো। যাই হোক, যাদের সাথে করার কথা তাদের তিনজনের ক্লোজ ফ্রেন্ড আর আগের পেপারের গ্রুপমেট কোর্সটা রিঅ্যাডভাইজ করে নেওয়ায় আমরা ওদের অনুরোধ করার প্ল্যান করি যাতে তাদের পুরোনো পার্টনারকে নেয়, আমরা আবীরকে নিয়ে আরেকটা গ্রুপ করবো। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই পরিচিত একজন শ্রদ্ধেয় বড় ভাই (যিনি এর আগেও অনেক কোর্স আমাদের সাথে করেছেন) আমার কাছে এসে বললেন, 'জিটু তুমি নাজিয়াকে বা হাসিবকে বাদ দিয়ে ওই গ্রুপে থেকে যাও। বিশেষ করে বলছি, হাসিবকে বাদ দিলে ভালো হয়। ও কি পারে? কিচ্ছু তো করবে না!'

উল্লেখিত বিশিষ্ট বড় ভাইয়ের কথায় আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমাদের সম্পর্কে অবজ্ঞাসূচক ভাল রকমের কথাবার্তা বললেন। যাই হোক, কথা শেষ হওয়ার পর এ ব্যাপারে কিছু না জানিয়ে নিজেরাই গ্রুপ ফর্ম করলাম। কথা দিয়ে তো আর কথা ভঙ্গ করা ঠিক না, আর আমি এদের কথা দিয়ে অন্যগ্রুপেও যেতে পারি না। গ্রুপে ছিলাম আমি, হাসিব, নাজিয়া, আবীর আর সাথে সোনিয়া, ইভা। অবজ্ঞাটা খুব খারাপ লেগেছিলো, তাই বাকীদের বললাম কাজটা সিরিয়াসলি নিতে।

টপিক বেছে নেয়া থেকে শুরু করে প্রাথমিক সব কাজে হাসিব অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করেছে। কাজ করতে গিয়ে সবচে বেশি কষ্ট হয় ডাটা কালেকশনে। বারডেমে টানা পাঁচদিন গিয়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই অফিস ওই অফিস ঘুরে কোন লাভ হয়নি। শেষে বাধ্য হয়ে দুদিন সময় হাতে নিয়ে ফেনী গিয়ে ফেনী ডায়বেটিক হাসপাতাল থেকে ডাটা নিয়ে আসতে হয়েছে, সে কাজও প্রায় অসম্ভব ছিলো যদি না ডাক্তার বৈশাখী আপু আশাতিত ভাবে সাহায্য না করতো। সিস্টেম রেডী করতে গিয়ে যে অ্যালগরিদমে সাদা চোখে মনে হয়েছে কাজ হবে না তাও সেই কাজটা করে দেখেছি যাতে আমাদের কাজে কোন ছোটখাটো ভুল না থাকে। এজন্য হাসিব আর আবীর তো রীতিমত আঁটঘাঁট বেঁধে যুদ্ধে নেমে আমাকে পঁচাইছে। একদিন তো ডাটা ইনপুট করে চেক করার সময় কি এক ছোট্ট ভুলের জন্য স্টাডি হলে উত্তেজিত হয়ে টেবিল চাপড়ে হাসিব আর নাজিয়াকে কি কি যেন বলে মেজাজ খারাপ করে দিয়েছি। কাজের গুরুত্ব বুঝে আমার খারাপ ব্যবহারটা বড় করে দেখেনি তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আর আবীরকে তো অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে শেষ তিনদিন। সিস্টেমের ম্যাথমেটিক্যাল সব ক্যালকুলেশন বার বার করিয়েছি। একদিন সন্ধ্যা থেকে পরদিন দুপুর ১টা পর্যন্ত চেয়ার থেকে উঠতে দেইনি বরং আমি আর হাসিব ওকে ঝাঁড়ি মারতে মারতে নিজেরাই মাঝে দুঘন্টা করে ঘুমিয়ে নিয়েছি।

পুরো ইমপ্লিমেন্টেড সিস্টেম সম্পর্কে পেপার একবার লিখে সেটা পুরোটা বাদ দিয়ে আবার নতুন করে লিখতে হয়েছে। তবে এতকিছুর পরও সবচে ভালো লেগেছে যখন ডঃ রাশেদ স্যার বললো তোমাদের কাজ খুব ভাল হয়েছে। স্যারকে অনেক জ্বালিয়েছি, এটা ওটা নিয়ে উনাকে মেইল করে আর অফিসে গিয়ে হেল্প চেয়ে। স্যারকেও ধন্যবাদ দিয়েও শেষ করা যাবে না তার অবদানের জন্য। অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। সবচে অবাক হয়েছি যখন পেপার স্যারকে ফাইনালী জমা দেয়ার দু'সাপ্তাহ না যেতেই স্প্রিংগার কনফারেন্সের জন্য পেপার অ্যাকসেপ্টেড হওয়ায়। আসলে কেমন মানের পেপার সেখানে অ্যাকসেপ্টেড হয় সেটাও জানতাম না, স্যার যদি গুরুত্বটা না বোঝাতো। শ্রদ্ধেয় রাশেদ স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

সত্যি বলতে ভালো মানের পেপার লেখার ইচ্ছে ছিলো শুধু অবজ্ঞার জবাব দেয়ার জন্য। এমন ছোটখাটো রিসার্চ পেপার আসলে অহরহ অনেকেরই পাবলিস হয়। আমরা যে কজন কাজ করেছি হয়তো কেউই অত আহমরি স্টুডেন্ট না, তাই নাক সিঁটকানো টাইপের কথা বলে, খোঁচা মারা কথা শুনেও কিছু বলতে পারিনি। শুধু ফোকাস ধরে রেখে সিরিয়াসলি নিজেদের কাজটুকু করার চেষ্টা করেছি আর তাতে বোধকরি সফল হয়েছি। বোধকরি, এভাবে সব কোর্সে যদি প্রথম থেকে সিরিয়াসলি পড়তাম তাহলে অসাধারণ রেজাল্ট নিয়ে বের হতে পারতাম।

মূলকথা বলি, আমরা ডায়বেটিস নির্ণয় নিয়ে Fuzzy Logic ব্যবহার করে একটা সিস্টেম ইমপ্লিমেন্ট করেছিলাম। টাইটেল Application of Fuzzy Logic for Generating Interpretable Pattern for Diabetes Disease in Bangladesh. চেক প্রজাতন্ত্রের টমাস বাটা ইউনিভার্সিটির উদ্দ্যোগে অনুষ্ঠিত 5th Computer Science On-line Conference 2016-তে আমাদের পেপারটা অ্যাকসেপ্টেড হয়। আজকে প্রেজেন্টেশন ছিলো। কিছুক্ষণ আগে Springer-এ আমাদের পেপারটা Artificial Intelligence Perspectives in Intelligent Systems সিরিজে পাবলিস হলো (লিংক প্রথম কমেন্টে)। যে কেউ চাইলে ২৯.৯৫ ইউ এস ডলারে কিনে নিতে পারেন!

এটা একটা সামান্য কাজ। এত বড় করে বলার কোন ইচ্ছে ছিলো না, আর আজকের পর কখনোই এই নিয়ে কথা বলবো না। তবে অবজ্ঞার একটা ছোট্ট জবাব দেয়ার ছিলো। ধন্যবাদ সেই মানুষকে যিনি আমাদের অবজ্ঞাসূচক কথাবার্তা বলে উৎসাহ দিয়েছেন। অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ তাকে। এমন লাইফ লেসন কয়জন দিতে পারে? !

Wednesday, 9 March 2016

বেদনার সুর

যে মানুষটাকে রাত-দুপুরে গালি দেই আর খুঁজে বেড়াই দোষ ত্রুটি, সেই মানুষটার কিছু গুণও আছে। তার কিছু কষ্টও আছে। আছে না বলা কিছু বেদনা। মানুষের মনের ভাষা বোঝার জন্য কাগুজে কোন বর্ণ নেই। বুকভরা হাহাকার লিপিবদ্ধের কোন শব্দ নেই। বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা যায় না বুকের মধ্যে থাকা শূন্যতা।

প্রকাশের অভাবে কত কত মানুষ আজ-ও নিজেই নিজের কবিতার কবি, নিজেই পাঠক.. নিজেই সমালোচক। যতই মানুষের ঘনিষ্ট হই, ততই তাদের বেদনার সুর কানের কাছাকাছি আসে। কষ্ট-দুঃখ-বেদনা এসব আছে বলেই প্রত্যেকটা মানুষই আপন কষ্টের বংশীবাদক, সুরটা সবার কানে যায় না। যারা পাশে গিয়ে বসে, একান্তে সময় কাটায়.. তারাই শোনে। মানুষগুলো সব দুঃখী, প্রকাশ্যে-কিংবা অপ্রকাশ্যে।

০৮/০৩/২০১৬
উত্তরা, ঢাকা।

বুক রিভিউ: বিএনপি সময়-অসময়

গত চার-পাঁচদিন বেশ সময় নিয়ে পড়ে শেষ করলাম লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের লেখা সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত 'বিএনপি : সময় অসময়' গ্রন্থটি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির গত ৩৭ বছরের উঠা-নামাই শুধু নয়, বিএনপি গঠনের প্রেক্ষাপট আর মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বিএনপি প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তারিত লেখা আছে এ বইয়ে। দশটি ভাগে ভাগ করে বিএনপির সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াসটা চমৎকার ছিলো।

'বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ'কে সরিয়ে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'কে সামনে এনে একদম ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে গড়ে উঠে বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যদিও প্রথমে 'জাগদল' আর পরে 'বিএনএফ' থেকে 'বিএনপি'তে পরিণত হয় দলটি। লেখক প্রথমেই জিয়ার মেজর থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার বর্ণনাটা খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।



একজন সামরিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে জিয়ার দুর্বল আর সবল দিকগুলো তুলে ধরে কিভাবে রাজনৈতিকদের মতো বক্তিতা দিয়ে মানুষ পটানোর ক্ষমতা না থাকার স্বত্তেও খালকাটাসহ মাইলের পর মাইল হেঁটে বিভিন্ন কর্মসূচী দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন তারও বিস্তারিত বর্ণনা বেশ আকর্ষণীয় দিক এই বইয়ের। একজন সেনাপতি থেকে একজন রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার বর্ণনটা পূর্ণাঙ্গ ক্যানভাসেই ফুটে উঠেছে মনে হয়েছে। জিয়ার মৃত্রুর পর সাত্তারের বিএনপি এবং তারপর হাতবদল হয়ে খালেদা জিয়ার বিএনপির হালধরার বর্ণনাটাও যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বর্ণনা করেছেন লেখক। একই ক্যানভাসে উঠে এসেছে এরশাদের সামরিক শাসন আর তৎকালীন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দলের ভূমিকা। এরপর নব্বইয়ের দশকে বিএনপির নবজাগরণ, ক্ষমতাসীন হয়ে তাদের নেতাদের কর্মকান্ড আর ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচন নিয়ে বিএনপির বিতর্কিত কার্যকলাপ নিয়ে বর্ণনাও অনেক তথ্যবহুল। তবে ছিয়ানব্বইয়ের পর থেকে বিরোধী দলে বিএনপির কর্মকান্ড, ২০০১-০৬ এর বিএনপির কর্মকান্ড কিংবা পরবর্তীতে বিএনপির কর্মকান্ড অত বড় পরিসরে আসেনি যদিও যতটুকু লেখক তুলে ধরেছেন তাতেই স্পষ্টতই বিএনপির নেতৃত্বের সংকট, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা আর একক নেতৃত্বের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কথা বেশ নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন।

এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণের প্র্যাকটিস খুব একটা নেই। সেই দিক বিবেচনায় এই বইটি বেশ ভাল একটি নমুনা হতে পারে। প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন বইয়ের আর পত্রিকার রেফারেন্স ব্যবহৃত হয়েছে এ বইয়ে, বইটি লিখতে নেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএনপির সাথে জড়িত অনেকেরই সাক্ষাৎকার। মুখের কথা শুনে শুনে মিথ বিশ্বাস না করে বরং এমন গ্রন্থ পড়ে যে কোন সাধারণ মানুষ কিংবা রাজনৈতিক কর্মীরই একটি দলের আদর্শ আর অতীত কর্মকান্ড তথা ইতিহাস জানতে সহায়ক হতে পারে। সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।

রিভিউ: ৮.৫/১০

Friday, 26 February 2016

বুক রিভিউঃ যে প্রহরে নেই আমি - রাসয়াত রহমান

উপন্যাসের শুরুটা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা। গল্পটা যাকে দিয়ে শুরু হয় সে এক আমেরিকান। নাম তার এন্ডারসন, এক ভবঘুরে আমেরিকান। ভাবছেন তার সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কি সম্পর্ক? উপন্যাসটায় একটার পর একটা ঘটনা যখন মোড়ে মোড়ে বাঁক নিবে তখন ঠিক তখন গল্পের কোন এক গলির মুখে এসে এই আমেরিকানের কোন আত্মীয় এসে হাজির হবে, গল্পটা শুরুর মতো শেষটায় এসে কোন এক বিদেশীর সামান্য ছোঁয়ায় হয়তো পূর্ণতা পাবে!

রহস্য বাদ দিয়ে উপন্যাসের মূল অংশে আসা যাক। গল্প আমাদের এই প্রজন্মের। মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নই মানুষকে বড় করে তোলে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগে কোন কোন দুর্ঘটনা জীবনের স্বপ্নটাকে দূর আকাশের তারাতে রূপান্তর করে। নায়লা তেমনই এক চরিত্র। অল্প বয়সে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে এক ব্যাংকারের ঘরণী। দুই সন্তান, জেরিন আর নাফি। জেরিনের বন্ধু তারিফ। শহুরে উচ্চবিত্ত বলতে যা বোঝায় সেই বিত্তবান কোন এক পরিবারের সন্তান। গল্পের এক মোড়ে এসে তারিফের পাশে দাঁড়াবে তার চাচা-চাচী জামিল আর সামান্থা। সামান্থা আর নায়লা স্কুল জীবনের সহপাঠী। মফস্বলের স্কুলে একসাথে পড়াশোনা ছিলো। দুইজনের জীবন দুই বাঁকে বেঁকে যায়। সামান্থা আইবিএর টিচার। সামান্থার স্বামী জামিলও নায়লার পূর্বপরিচিত, একই শহরে বেড়ে ওঠা। কিন্তু এই পরিচয়ের মাঝে কিন্তু ছিলো। কিন্তুটা উপন্যাসে লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বাকী রইলো রাজু। বাগেরহাটের ছেলে। খুলনায় পড়ালেখা করেছে, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছে। পিওর টেলেন্ট যাকে বলে তেমন মেধাবী। প্রথমেই যে বলেছি উপন্যাসে ঘটনা শুধু বাঁক নেয়, আসলে বাঁক নেয় না। এই রাজু ছেলেটা বাঁক খাওয়ায়। ক্রিকেটে যেমন স্পিনার বল করার সময় বলের বাঁক নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমন এই ছেলেটা উপন্যাসের অনেকাংশ জুড়ে বাঁক খাওয়ায়। এই ছেলেকে এক একবার এক এক জায়গায় দেখা যাবে। কখনো ঢাকার কোন মেছে, আবার কখনো জামিল-সামান্থার বাসায় আশ্রিত হতে, আবার কখনো নায়লার বাসায় অতিথি হিসেবে আর কখনোবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হলে।

জীবনটা অদ্ভূত। আর অদ্ভূত জীবনটার রহস্যগুলো আবিষ্কার করে বসে জীবনটা সহজ করে রাজুর মতো মানুষেরা। স্বপ্ন হারানো মানুষের স্বপ্নকে খুঁজে দেয়া, চরম বিপর্যস্ত মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও বিপদমুক্ত করা -এসব তার মতো সাধারণ মানুষের অসাধারণ কাজ। লেখক এই কাজটা খুব সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন।

বাকী রইলো মুক্তিযোদ্ধা জলিল সাহেব। এই চরিত্রটা উপন্যাসকে সম্পূর্ণতা দিয়েছেন।

বইছিলাম লেখক রাসয়াত রহমান জিকোর নতুন উপন্যাস 'যে প্রহরে নেই আমি'। বইটা কিনে কখন যে পড়তে বসে শেষ করে ফেলেছি টের পাইনি। খুব চমৎকারভাবে একটার পর একটা ঘটনার সিকোয়েন্স বর্ণনা। লেখক যতই দাবি করুক তিনি সময় দিয়ে লিখতে পারেননি, তবে আমার পড়া তার সেরা বই এটি। তুলনা দেয়া ঠিক হবে কিনা জানিনা, তবে গল্প শেষ করে মনে হলো 'আরেহ্! এতো দেখি চেতন ভগতকেও হার মানানো গল্প লিখলো!'

এক কথায় অসাধারণ এক উপন্যাস। না পড়লে মিস করবেন টাইপের।


ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৬

Thursday, 18 February 2016

দীর্ঘশ্বাস

: 'কারো সাথে সম্পর্ক আছে?'
প্রায়ই স্মিত হেসে উত্তর দেই, 'নেই'। আসলে মিথ্যে বলা হয়।

সম্পর্ক আছে। দীর্ঘশ্বাসের সম্পর্ক। হুট করে অনেক বছর পর এখানে-ওখানে কারো কারো দেখা পেলে শ্বাসটা দীর্ঘ হয়। কবি হলে বলতাম, 'এমন তো হওয়ার ছিলো না!' জীবনানন্দ হলে বলতাম, 'এতদিন কোথায় ছিলেম?'

বলা হয় না কিছুই। না তাকে, না অন্য কাউকে। না গদ্যে, না পদ্যে। কোথায় না। পারলে নির্মলেন্দুর মতো বলতাম, 'নীরা ভালোবাসেনি!'
কিংবা লতিফুর ইসলাম শিবলীর মতো কোন গ্রিক তরুণীকে বলতাম, 'তুমি কি আমার আকাশি হবে?'

বলা হয় না কাউকে কিছুই। শুধু বুকের মধ্যে পাথর চেপে রাখা, আর সুদীর্ঘ হাহাকারে বিলীন হওয়া অার্তনাদের প্রতিধ্বনি শুনি।

ভূপেনের মতো যদি বলি,
'চেনা চেনা সুরটিকে কিছুতে না চিনি।
নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি।
প্রতিধ্বনি শুনি আমি প্রতিধ্বনি শুনি।'

Friday, 31 July 2015

কানাই তুমি খেইড় খেলাও ক্যানে?

১.

পৃথিবীর সবচে কষ্টের কাজগুলোর একটা হল এই সুদূর উত্তরা থেকে জ্যাম ঠেলে ঠেলে নীলক্ষেত যাওয়া, আবার আসা। আর এই কষ্টের কাজটা এড়াতে কিছু বাড়তি পয়সা গেলেও অনলাইনে বই অর্ডার করে কিনে নেই। কিন্তু ঈদের ছুটি থাকায় বই ডেলিভারী বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়েই নীলক্ষেত গিয়ে কিছু বই কিনে নিয়ে এলাম গত শুক্রবার। ভাবছিলাম সোমবার থেকে মোটামুটি ফ্রি থাকবো, শুক্রবারের মধ্যেই কিছু পড়া হয়ে যাবে আর অবসরটাও ভালই কাটবে। কিন্তু যেমন ভাবনা তেমনভাবে কি দুনিয়া চলে? কিছুই হয়নি। 'ক্রাচের কর্নেল' শুরু করেও বেশীদূর যেতে পারিনি এখনো। তবে বেশ ভালো লাগছে বইটা, যদিও উপন্যাসটার মূল পরিণতি মানে কর্ণেল তাহেরে ফাঁসি হয়ে যাবে শেষে জানি তবুও বইটা পড়ে অনেক তথ্যই জানতে পারছি। ওহ্.. এটা উপন্যাস কি না এ নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। রিভিউ জানতে গিয়েই ফেসবুকে বইপোকা গ্রুপে তুমুল বিতর্ক দেখলাম। বইয়ের লেখক সাহাদুজ্জামান আদৌ কোন উপন্যাসিক কিনা এ নিয়ে কিংবা সে মূলত ছোটগল্পকার - এসব নিয়ে বিতর্ক দেখে বইটা পড়ার উৎসাহ অনেকাংশেই বেড়ে গিয়েছিলো। তবে বইটা পড়া আমার কাছে সরাসরি না দেখা কোন বিখ্যাত ফুটবল ম্যাচের রিটেলিকাস্ট দেখছি, যার ফলাফল আগের থেকেই জানি।


২.

গত কিছুদিন ধরেই হুটহাট অনেকের সাথে পরিচয় হচ্ছে। ব্যাপারটা অনেকদিন ধরে হচ্ছিলো না। ভার্সিটিতে ভর্তির পর টানা দেড়-দুই বছর অনেক অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে, অনেকের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়েছে, অনেকের সাথে হাই-হ্যালো সম্পর্ক আর কারো কারো সাথে মনকষাকষিতে সম্পর্কই ভেঙ্গে গেছে - এমনটা সচরাচর হয় আরকি। রিভার সাথে পরিচয় কবে ঠিক মনে নেই, তবে আমাদের টিনএজের শেষের দিকে যখন মিগ৩৩ বা মিগ থার্টি থ্রি খুব জনপ্রিয় ছিলো মোবাইলে চ্যাটিং সফটওয়্যার হিসেবে তখন রঙ্গের মেলা নামে গ্রুপে। ফেসবুকেও ছিলো তখন থেকেই তবে লাইক-কমেন্টের বাইরে 'টুঁ' শব্দটাও চ্যাট হয়নি এমন আরকি। তো হঠাৎ করে কয়েকমাস আগে চ্যাট হলো, তাও খুব সম্ভবত শুক্রবার জুম্মার নামাজের টাইমে স্ট্যাটাস আপডেট করায় নামাজ পড়ি কিনা জিজ্ঞেস করেছিলো। তো যা হবার, কথায় কথায় এখন তুই তোকারি করে পচায় আরকি যে কিনা তিন-চার বছর ধরে আপনি-তুমির বাইরে সম্ভোধন করেনি। এ জন্যই বোধহয় জীবনের নাম 'গেবন' হয়ে গেছে!


৩.

কোন এক অদ্ভূত কারণে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাপারে কিছু অবিশ্বাস্য মিথ চালু আছে। যেমন 'তারা কিছু পড়া লাগে না - এমনি এমনি ভাল গ্রেড পায়', 'টাকা দিয়ে পড়ে তাই এদের না পড়লেও রেজাল্ট ভালো হয়', 'এরা কিছু পারে না খামোখাই ভাব মারে', 'এরা ভার্সিটিতে গিয়ে আড্ডা মারে-এখানে ওখানে খেতে যায় আর সেলফি তোলে আপলোড মারে.. এরা কি ক্লাসে যায় নাকি কখনো? পড়ালেখা তো দূরের ব্যাপার।'  ইত্যাদি ইত্যাদি। তো আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কষে থাপ্পর মারি এমন কথা বলা কিছু মানুষকে। এরা দু-একজনের লাইফস্টাইল দেখে সহজ সমীকরণ দিয়ে বখাইট্টা যুক্তি দেখান যে 'অমুক এটা করে, অতএব অমুকের ভার্সিটির সবাই এটাই করে'! বিশেষ করে থাপরাইতে ইচ্ছে করে যখন অনেক কষ্টে খেঁটে মেটে প্রোজেক্ট, আসাইনমেন্ট, পরীক্ষা সব ঠিকভাবে দেয়ার পরও এ-এ মাইনাস ছুটে যায় তখন। ঈদের ছুটিতে এ টাইপের কথাবার্তা শুনে গতকিছুদিন ধরেই মিস্টার মেজাজ আর তার 'বরফ স্টেট' থেকে উওপ্ত উনুনে জ্বলছে। যাই হোক, পলিটিক্যাল সাইন্স কোর্সের ইনস্ট্রাক্টর এক আমেরিকান ভদ্রমহিলা (এবং পলিটিশিয়ান)। সত্যি বলতে এ কোর্সের মতো মজার কোর্স আমি আমার ইহজগতে কম করছি। মঙ্গলবার ছিলো গ্রুপ প্রেজেন্টেশন। প্রেজেন্টেশন টপিক ছিলো সার্ক। আর আমাদের গ্রুপ রবিবার পর্যন্ত কোন কাজই করিনি। আমাদের গ্রুপের নাম 'মিশন ইম্পসিবল'। তো সোমবার মিড দিয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বিকেলে উঠে শুরু করলাম কাজ, ইম্পসিবল মিশনকে পসিবল করে পরের দিনের জন্য প্রেজেন্টেশন স্লাইড রেডী করা। ত্রিশ মিনিটের প্রেজেন্টশন, অতএব পাঁচজনকে সর্বনিন্ম পাঁচ মিনিট তো প্রেজেন্ট করতেই হবে। সে হিসেবে ডকুমেন্ট আর সাইট ঘেঁটে অনেক তথ্য বের করে বানাতে লাগলাম। আমার পার্ট শেষ করে গ্রুপমেটদের অবস্থা দেখলাম। ভার্সিটির গ্রুপ ওয়ার্ক মানে পাঁচজনের একজন বা দুজন কাজ করা আর বাকীরা লাট সাহেবের মতো পায়ের উপর পা তুলে ঘুম প্র্যাকটিস করা। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই কোর্সের গ্রুপটায় মোটামুটি সবাই অ্যাকটিভ, তাই কাজ করতে ভালই লাগে। সবাই রাত একটার মধ্যে যার যার পার্টের কাজ পাঠিয়ে দিলো, আর আমি সবগুলো জোড়া লাগিয়ে পাওয়ার পয়েন্টে দাঁড় করাতে রাত প্রায় চারটা হয়ে গেল। পরদিন সকাল সাড়ে নয়টা প্রেজেন্টেশন! দুচোখের অভিমান ভাঙ্গাতে ঘুমুতে গেলাম সাড়ে পাঁচটায়!


৪.

রাতে বারোটার দিকে রিভা নক দিলো ফেসবুকে, 'দোস্ত, বাসায় আসলাম'। আগেরদিন রিভার আম্মু রাস্তার গর্তে পড়ে পা ভেঙ্গে গেছে। পঙ্গু হাসপাতালে রয়েছে। ঢাকা শহরে বিনা নোটিসে বৃষ্টির মাঝে যেমন অলি-গলি সব তলিয়ে যায় হুট করে ঠিক তেমনি মানুষের হাত-পা ভাঙ্গার কোন ঠিক ঠিকানা নেই আসলে। আমি নিজেই এক বছরের ব্যাবধানে পা-হাত ভেঙ্গেছিলাম দুবছর আগে। আহা, সে কি যন্ত্রণা! একটু পর রাশেদ নক দিয়ে বলে, 'ভাই নার্ভাস লাগছে। কাল প্রেজেন্টেশনে কি বলবো বুঝতেছিনা!' আমি হাসি, আরে মিয়া যা মুখে আসে বলে দিবা। বিদেশী ফ্যাকাল্টি মেম্বার, ভালো আছে মানুষটা!

রাশেদ ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট। পলিটিকাল সাইন্সে আমার গ্রুপমেট। হাসিখুশি মানুষ, অল্প কদিনেই বেশ ভাল সম্পর্ক হয়ে গেছে। দেখামাত্রই একটা হাসি বরাদ্দ আছে, আর বলে, 'মিয়া কোর্সে তো ফাঁটাবা.. আমি তো পলিটিক্স কম বুঝি.. কি যে হবে..' বলেই আবার হাসি! দেশের বাড়ী রাঙ্গামাটি আর পরিবারসহ থাকে উত্তরায়। আগেরদিনই ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় এলো। তো রাতে আবার প্রেজেন্টেশন স্লাইড রেডি করার শেষের দিকে আমিই নক দিলাম, ও বলে.. 'ভাই.. কি যে হবে কাল! প্রেজেন্টেশন যে কি দিবো' লিখেই দুজনের ইমোটিকন বিনিময়.. হাহা-হিহি!



৫.

দেড় ঘন্টার ছোটখাটো ঘুম দিয়ে সকালে বাসা থেকে বের হতে হতেই সাড়ে সাতটা বেজে গেলো। রাজলক্ষী পৌঁছাতেই রাশেদের ফোন। হ্যালো বলার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে রাশেদের গলাটা রাশভারী মনে হলো। ফুরফুরে মেজাজের কোন ছোঁয়াও নেই গলায়। বললো, তার বাবা খুব অসুস্থ, চিটাগাং-এ হসপিটালে ভর্তি করানো হয়েছে.. অবস্থা সুবিধার না। চিটাগাং যাচ্ছে ও, ম্যাডামকে যেন জানাই ওর ব্যাপারটা। ও যখন বললো অবস্থা সুবিধার না তখন বুকের ভের ধক্ করে উঠলো। আমার ঠিক ছয় বছর আগের কথা মনে পড়লো। ২৬ মে, ২০০৯। আসলে ঘুরে ফিরে বোধহয় সবাইকে এমন দিন ফেইস করতে হয়, তবু দোয়া করছিলাম আমার মতো পরিণতি যাতে তার এখনই না দেখতে হয়।


৬.

প্রেজেন্টেশন বেশ ভালোই হলো, আর ম্যাডাম-ও খুশী হলো। প্রেজেন্টেশনের শেষে সার্ক অ্যানথিমটার ভিডিও প্লে করলাম, ম্যাডাম উপমহাদেশীয় নাচ-গান আর বিভিন্ন জায়গার উপর করা দেড় মিনিটের ভিডিওটা বেশ পছন্দ করলেন। ওদিন আর কোন ক্লাস না থাকায় বেশ ফুরফুরে মেজাজে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরছিলাম। বদ-অভ্যাসবসত বাসে বসেই মোবাইল গুতানো শুরু করলাম, ফেবু হোমপেইজে দেখি রাশেদকে ট্যাগ করে ওর কোন এক বন্ধু স্ট্যাটাস পোষ্ট করেছে। স্পষ্ট করে লেখা না থাকলেও যা বুঝলাম তার মানে দাঁড়াচ্ছে রাশেদের বাবা বোধহয় ওপারেই পাড়ি জমিয়েছেন। মানে আমর ২৬ মে-টা বোধহয় রাশেদের জন্য ২৮ জুলাই এলো। ঘুমিয়ে পড়লাম দুপুরে, রাতে ঘুম থেকে উঠে ওর টাইমলাইনে গিয়ে দেখলাম অনেকেই পোষ্ট করেছে। মানে যা ভাবছিলাম তা-ই! হাত পা ভাঙ্গা বোধহয় অনেক ভালো, তবে এমন হুটহাট মৃত্যুদূত এসে জলজ্যান্ত একটা মানুষকে ওপারে নিয়ে চলে যাওয়া সত্যিই বড় কষ্টের। পৃথিবীর একটা অদ্ভূত ব্যাপার হলো এক জায়গায় ভূমিকম্প হয়ে ভেঙ্গে-চুরে গেলেও বাকী পৃথিবীর কিছুই হয় না। ঠিক তেমনই কারো আপনজন চলে গেলে তার বুকের ভেতরের ভূমিকম্পটা বোধহয় পৃথিবীর অন্য মানুষরা টের পায় না। শুধু ধ্বংসাবশেষই দেখতে পায়। ভূমিকম্প এবার আমার ভেতরটায় হয়নি, তবে জানি রাশেদের ভেতরে ঠিক কতটা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে!

"কানাই তুমি খেইড় খেলাও ক্যানে?"

ভোর ৪টা ৪৪
৩‌১ জুলাই, ২০১৫
উত্তরা।