Showing posts with label বই রিভিউ. Show all posts
Showing posts with label বই রিভিউ. Show all posts

Tuesday, 14 February 2017

বুক রিভিউ: দারবিশ - লতিফুল ইসলাম শিবলী


অন্যায়ভাবে একটা তরুণ প্রজন্মকে জোর করে ভিয়েতনাম যুদ্ধে পাঠাচ্ছিলো যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ষাট থেকে আশির দশকের সেই দিনগুলোতে আমেরিকা সরকারের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিলো তখনকার তরুণ প্রজন্মের অনেকেই। রক্তক্ষয় আর অন্ধকার রাজনীতির বিরুদ্ধে দাড়িয়ে যায় সানফ্রান্সিসকো ভিত্তিক প্রথাবিরোধী হিপ্পী আন্দোলন। সেখানেই যোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক বাংলাদেশী তরুণ। শান্তির স্বপক্ষে ঘরে-বাইরের এ যুদ্ধে তরুণটির স্বক্রিয় অংশগ্রহণের সময়ই পরিচয় আরেক আন্দোলনরত আমেরিকান মেলানির সাথে। পরিচয় থেকে পরিণয়। ঘটনাক্রমে পুলিশের ওয়ারেন্ট পেয়ে মেলানি পালিয়ে যাচ্ছিলো মেক্সিকো, সাথে সে বাঙ্গালী তরুণ। পুলিশের ঝড়-ঝঞ্চা পেরিয়ে দুজন যখন মেক্সিকো সীমান্তে গিয়ে ঘটে দুর্ঘটনা, পরিণতি হয়ে অনৈচ্ছিক বিচ্ছেদে। অন্ধকার কুঠায় হারিয়ে যায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো বছর।

তারপর ভাগ্য নিয়ে বাঙ্গালী তরুণের বাজি খেলা। অনেকবছর পর সেই বাঙ্গালী তরুণ যখন বৃদ্ধ হয়ে গেল, এই ঢাকা শহরেরই অভিজাত এলাকায় তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। নিশ্চিত ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ককে বাঁচিয়ে নিজেই কোথায় যেন চলে গেলেন। তিনি কি খুঁজে পেয়েছেন তার হারিয়ে ফেলা এতগুলো বছর? ফিরে পেয়েছেন তার সেই ভীনদেশী প্রেমিকাকে? নাকি জীবন দিলেন অন্য কোন যুগলকে?

চমৎকার এ কাহিনী নিয়ে প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি লতিফুল ইসলাম শিবলীর 'দারবিশ' উপন্যাসটা পড়তে পড়তে অনেক প্রশ্ন মাথায় আসে। যুদ্ধ, ভালবাসা, মমতা, সততা, বিশ্বাস, দেশপ্রেম - সব যেন এক মলাটেই বন্দী করেছেন। অন্য আট-দশটা কাহিনীর চেয়ে এখানে গল্পের মেসেজটাও তাই শিক্ষণীয়। ভাল লাগলো উপন্যাসটা।



Thursday, 5 May 2016

রিভিউঃ আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে

কিউবার মতো আমেরিকার নাকের ডগায় থাকা একটা দেশ স্পেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সাহায্য পায় আমেরিকার। তারপর? বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদী আমেরিকা দখল করে কিউবার অর্থনীতি। পুতুল সরকার বসিয়ে কিউবার সম্পদ অাহরণ বেশ ভালোভাবেই করছিলো। এক স্পেনিশ বাবা আর কিউবান মায়ের ঘরে জন্ম হয় ক্যাস্ট্রোর.. ফিদেল ক্যাস্ট্রো। শৈশবেই প্রথা অনুযায়ী পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বাবা-মায়ের থেকে দূরে পাঠানো, তারপর একসময় বোর্ডিং স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে রাজনীতিতে পা। পুঁজিবাদে বড়ই অনাস্থা। নিজের ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোকে সাথে নিয়ে গেরিলা দল বানিয়ে সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, সামরিক বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে বন্দী জীবন, মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে আসা, জীবন বাঁচাতে মেক্সিকো গমন, চে গুয়েভারার সান্নিধ্য, একসাথে কিউবায় আক্রমণ, চূড়ান্ত বিজয়, আমেরিকার সাথে স্বল্পশক্তি নিয়েও যুদ্ধে প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার স্বত্তেও মাথা উঁচু করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সোভিয়েত পতনের পরও সমাজতন্ত্র নিয়ে সফলভাবে দেশ পরিচালনা আর বিশ্বমিডিয়ায় ক্রমাগত উদ্দেশ্যমূলকভাবে খলনায়ক আর একনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের পরও কিভাবে দেশের জনগণের ভালবাসায় এখনো সিক্ত হন সে সব নিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রে গল্প করেছেন বাংলাদেশী এক তরুণের সাথে।


কাল্পনিক সাক্ষাতকার হলেও লেখক শাহাদুজ্জামান বেশ চমৎকারভাবে ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ক্যাস্ট্রোর আদর্শকে এবং জীবনীকে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। এক কথায় বইটিকে বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম সেরা ডকুফিকশনের স্বীকৃতি দিতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না!

Wednesday, 9 March 2016

বুক রিভিউ: বিএনপি সময়-অসময়

গত চার-পাঁচদিন বেশ সময় নিয়ে পড়ে শেষ করলাম লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের লেখা সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত 'বিএনপি : সময় অসময়' গ্রন্থটি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির গত ৩৭ বছরের উঠা-নামাই শুধু নয়, বিএনপি গঠনের প্রেক্ষাপট আর মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বিএনপি প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের কার্যকলাপ নিয়ে বিস্তারিত লেখা আছে এ বইয়ে। দশটি ভাগে ভাগ করে বিএনপির সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াসটা চমৎকার ছিলো।

'বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ'কে সরিয়ে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'কে সামনে এনে একদম ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে গড়ে উঠে বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যদিও প্রথমে 'জাগদল' আর পরে 'বিএনএফ' থেকে 'বিএনপি'তে পরিণত হয় দলটি। লেখক প্রথমেই জিয়ার মেজর থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার বর্ণনাটা খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।



একজন সামরিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে জিয়ার দুর্বল আর সবল দিকগুলো তুলে ধরে কিভাবে রাজনৈতিকদের মতো বক্তিতা দিয়ে মানুষ পটানোর ক্ষমতা না থাকার স্বত্তেও খালকাটাসহ মাইলের পর মাইল হেঁটে বিভিন্ন কর্মসূচী দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন তারও বিস্তারিত বর্ণনা বেশ আকর্ষণীয় দিক এই বইয়ের। একজন সেনাপতি থেকে একজন রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার বর্ণনটা পূর্ণাঙ্গ ক্যানভাসেই ফুটে উঠেছে মনে হয়েছে। জিয়ার মৃত্রুর পর সাত্তারের বিএনপি এবং তারপর হাতবদল হয়ে খালেদা জিয়ার বিএনপির হালধরার বর্ণনাটাও যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বর্ণনা করেছেন লেখক। একই ক্যানভাসে উঠে এসেছে এরশাদের সামরিক শাসন আর তৎকালীন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দলের ভূমিকা। এরপর নব্বইয়ের দশকে বিএনপির নবজাগরণ, ক্ষমতাসীন হয়ে তাদের নেতাদের কর্মকান্ড আর ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচন নিয়ে বিএনপির বিতর্কিত কার্যকলাপ নিয়ে বর্ণনাও অনেক তথ্যবহুল। তবে ছিয়ানব্বইয়ের পর থেকে বিরোধী দলে বিএনপির কর্মকান্ড, ২০০১-০৬ এর বিএনপির কর্মকান্ড কিংবা পরবর্তীতে বিএনপির কর্মকান্ড অত বড় পরিসরে আসেনি যদিও যতটুকু লেখক তুলে ধরেছেন তাতেই স্পষ্টতই বিএনপির নেতৃত্বের সংকট, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা আর একক নেতৃত্বের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কথা বেশ নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন।

এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণের প্র্যাকটিস খুব একটা নেই। সেই দিক বিবেচনায় এই বইটি বেশ ভাল একটি নমুনা হতে পারে। প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন বইয়ের আর পত্রিকার রেফারেন্স ব্যবহৃত হয়েছে এ বইয়ে, বইটি লিখতে নেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএনপির সাথে জড়িত অনেকেরই সাক্ষাৎকার। মুখের কথা শুনে শুনে মিথ বিশ্বাস না করে বরং এমন গ্রন্থ পড়ে যে কোন সাধারণ মানুষ কিংবা রাজনৈতিক কর্মীরই একটি দলের আদর্শ আর অতীত কর্মকান্ড তথা ইতিহাস জানতে সহায়ক হতে পারে। সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।

রিভিউ: ৮.৫/১০

Friday, 26 February 2016

বুক রিভিউঃ যে প্রহরে নেই আমি - রাসয়াত রহমান

উপন্যাসের শুরুটা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা। গল্পটা যাকে দিয়ে শুরু হয় সে এক আমেরিকান। নাম তার এন্ডারসন, এক ভবঘুরে আমেরিকান। ভাবছেন তার সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কি সম্পর্ক? উপন্যাসটায় একটার পর একটা ঘটনা যখন মোড়ে মোড়ে বাঁক নিবে তখন ঠিক তখন গল্পের কোন এক গলির মুখে এসে এই আমেরিকানের কোন আত্মীয় এসে হাজির হবে, গল্পটা শুরুর মতো শেষটায় এসে কোন এক বিদেশীর সামান্য ছোঁয়ায় হয়তো পূর্ণতা পাবে!

রহস্য বাদ দিয়ে উপন্যাসের মূল অংশে আসা যাক। গল্প আমাদের এই প্রজন্মের। মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নই মানুষকে বড় করে তোলে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগে কোন কোন দুর্ঘটনা জীবনের স্বপ্নটাকে দূর আকাশের তারাতে রূপান্তর করে। নায়লা তেমনই এক চরিত্র। অল্প বয়সে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে এক ব্যাংকারের ঘরণী। দুই সন্তান, জেরিন আর নাফি। জেরিনের বন্ধু তারিফ। শহুরে উচ্চবিত্ত বলতে যা বোঝায় সেই বিত্তবান কোন এক পরিবারের সন্তান। গল্পের এক মোড়ে এসে তারিফের পাশে দাঁড়াবে তার চাচা-চাচী জামিল আর সামান্থা। সামান্থা আর নায়লা স্কুল জীবনের সহপাঠী। মফস্বলের স্কুলে একসাথে পড়াশোনা ছিলো। দুইজনের জীবন দুই বাঁকে বেঁকে যায়। সামান্থা আইবিএর টিচার। সামান্থার স্বামী জামিলও নায়লার পূর্বপরিচিত, একই শহরে বেড়ে ওঠা। কিন্তু এই পরিচয়ের মাঝে কিন্তু ছিলো। কিন্তুটা উপন্যাসে লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বাকী রইলো রাজু। বাগেরহাটের ছেলে। খুলনায় পড়ালেখা করেছে, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছে। পিওর টেলেন্ট যাকে বলে তেমন মেধাবী। প্রথমেই যে বলেছি উপন্যাসে ঘটনা শুধু বাঁক নেয়, আসলে বাঁক নেয় না। এই রাজু ছেলেটা বাঁক খাওয়ায়। ক্রিকেটে যেমন স্পিনার বল করার সময় বলের বাঁক নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমন এই ছেলেটা উপন্যাসের অনেকাংশ জুড়ে বাঁক খাওয়ায়। এই ছেলেকে এক একবার এক এক জায়গায় দেখা যাবে। কখনো ঢাকার কোন মেছে, আবার কখনো জামিল-সামান্থার বাসায় আশ্রিত হতে, আবার কখনো নায়লার বাসায় অতিথি হিসেবে আর কখনোবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হলে।

জীবনটা অদ্ভূত। আর অদ্ভূত জীবনটার রহস্যগুলো আবিষ্কার করে বসে জীবনটা সহজ করে রাজুর মতো মানুষেরা। স্বপ্ন হারানো মানুষের স্বপ্নকে খুঁজে দেয়া, চরম বিপর্যস্ত মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও বিপদমুক্ত করা -এসব তার মতো সাধারণ মানুষের অসাধারণ কাজ। লেখক এই কাজটা খুব সুন্দরভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন।

বাকী রইলো মুক্তিযোদ্ধা জলিল সাহেব। এই চরিত্রটা উপন্যাসকে সম্পূর্ণতা দিয়েছেন।

বইছিলাম লেখক রাসয়াত রহমান জিকোর নতুন উপন্যাস 'যে প্রহরে নেই আমি'। বইটা কিনে কখন যে পড়তে বসে শেষ করে ফেলেছি টের পাইনি। খুব চমৎকারভাবে একটার পর একটা ঘটনার সিকোয়েন্স বর্ণনা। লেখক যতই দাবি করুক তিনি সময় দিয়ে লিখতে পারেননি, তবে আমার পড়া তার সেরা বই এটি। তুলনা দেয়া ঠিক হবে কিনা জানিনা, তবে গল্প শেষ করে মনে হলো 'আরেহ্! এতো দেখি চেতন ভগতকেও হার মানানো গল্প লিখলো!'

এক কথায় অসাধারণ এক উপন্যাস। না পড়লে মিস করবেন টাইপের।


ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৬